ল্যান্ডিংয়ের সময় সাক্ষাৎ মৃত্যু! অ্যামাজনের কার্গো বিমানে ভয়াবহ আগুন, মুহূর্তেই ছাই সব!

মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল বিশ্ব। রানওয়ে থেকে ছিটকে বেরিয়ে সোজা একাধিক গাড়িতে গিয়ে ধাক্কা মারে অ্যামাজন প্রাইম এয়ারের একটি কার্গো বিমান। এই ভয়াবহ সংঘর্ষের পরেই বিমানটিতে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর দু’টোর নাগাদ ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের কিছু পরেই প্রাইম এয়ার ফ্লাইট ৭৫৯৮ বিমানটি মায়ামি বিমানবন্দরের রানওয়ে অতিক্রম করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাইরে ছিটকে পড়ে। মায়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ-এর প্রধান রায়েদ “রে” জাদাল্লা সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাঁচজন মানুষের মৃত্যু তো বটেই, আরও পাঁচজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় তাঁদের সরাসরি ট্রমা সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে এবং বাকি দু’জনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রধান জাদাল্লা আরও জানান যে, বিমানটির আকস্মিক ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলোর ভেতরে বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক আটকে পড়েছিলেন, যাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে উদ্ধারকারী দলকে চরম বেগ পেতে হয়। এছাড়া দুর্ঘটনার পরপরই বিমানের পাইলট ও কো-পাইলটও ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তবে এখনও পর্যন্ত নিহতদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার আকস্মিকতা ও তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ৬০টিরও বেশি উদ্ধারকারী দল এবং প্রায় ২০০ জন দক্ষ জরুরি কর্মী ময়দানে নামেন। বিকেলের দিকেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিমানটির জ্বালানি লিকেজ বা লিক হওয়া রোধ করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার পরপরই নিরাপত্তার খাতিরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সমস্ত ফ্লাইট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। তবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় রবিবার সন্ধ্যার মধ্যেই বিমানবন্দরের মোট চারটি রানওয়ের মধ্যে দু’টি রানওয়ে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুর্ঘটনার ছবিগুলিতে দেখা গিয়েছে যে, বিমানটির সামনের অংশ বা নোজ মারাত্মকভাবে মাটির সঙ্গে মিশে আছে এবং পেছনের অংশ বা টেইল উপরের দিকে খাড়া হয়ে উঠেছে। তাছাড়া বিমানটির ডান পাশে মারাত্মক পুড়ে যাওয়ার কালো দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং পরিষেবা ‘ফ্লাইটরাডার২৪’ সূত্রে জানা গিয়েছে যে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি যখন রানওয়ে থেকে বাইরে ছিটকে পড়ে, তখন সেটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১২ নট বা প্রায় ১২৯ মাইল। পুয়ের্তো রিকোর সান জুয়ান থেকে মায়ামি অভিমুখে উড়ে আসা এই বিমানটি ছিল একটি ৩২ বছরের পুরনো বোয়িং ৭৬৭-৩০০ মডেলের কার্গো বা মালবাহী বিমান। বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, এই বিমানটি ১৯৯৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের যাত্রী পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো এবং বর্তমানে ‘২১ এয়ার’ নামের একটি কার্গো এয়ারলাইন অ্যামাজনের হয়ে এটি পরিচালনা করছিল। ‘২১ এয়ার’-এর পক্ষ থেকেও এক শোকবার্তায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
অ্যামাজনের মুখপাত্র কেলি ন্যান্টেল এক বিবৃতির মাধ্যমে গোটা ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন, “আমরা নিশ্চিত করছি যে ‘২১ এয়ার’ পরিচালিত আমাদের একটি বিমান আজ মায়ামি বিমানবন্দরে দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হল সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা, সুচিকিৎসা ও দেখভাল নিশ্চিত করা। ঠিক কী কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল, তা উদঘাটন করতে আমরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি।” ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত দুর্ঘটনা তদন্তকারী শীর্ষ সংস্থা ‘ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড’ বা এনটিএসবি (NTSB) চেয়ারওম্যান জেনিফার হোমেনডির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায় তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। সোমবারই এই সংক্রান্ত প্রথম সরকারি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পর এটি অ্যামাজন প্রাইম এয়ারের কোনো বিমানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বড় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, যা নতুন করে বিমান নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।