খাতার কলমে আইন নয়, এবার মোক্ষম চাল! বিশ্বজুড়ে কড়া হাতে বাল্যবিবাহ দমনের ঘোষণা রাষ্ট্রপুঞ্জের

বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে এবার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এখন থেকে প্রতি বছর ২৭ নভেম্বর দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক বাল্যবিবাহ নির্মূলকরণ দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। শুধু বাল্যবিবাহ রোধ করাই নয়, এই বিশেষ দিনটি একই সঙ্গে শিশু, বাল্য এবং জোরপূর্বক বিবাহ নির্মূলকরণ দিবস হিসেবেও সারা বিশ্বে পালিত হবে।

আন্তর্জাতিক স্তরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সিয়েরা লিওনের তরফে এই প্রস্তাবটি পেশ করা হয়েছিল। খসড়া সেই প্রস্তাবে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৬৬টি দেশ সরাসরি সমর্থন জানায়। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে পূর্ণ সমর্থন জোগায় ভারত ছাড়াও কাবো ভার্দে, মরক্কো, কস্টা রিকা, নামিবিয়া, রুয়ান্ডা, সুদান এবং আফগানিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলি। শিশুদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং বাল্যবিবাহের অন্ধকার থেকে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে বহু বছর ধরে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। অবশেষে সেই দীর্ঘ লড়াই এক অনন্য প্রশাসনিক স্বীকৃতি পেল।

রাষ্ট্রপুঞ্জে পেশ করা ওই প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না, বরং বিশ্বজুড়ে সমস্ত দেশের সরকার, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন শাখা, সুশীল সমাজ এবং অন্যান্য সংস্থাকে আরও অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প একেবারে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার প্রসারে বিশেষ জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ২৭ নভেম্বর দিনটি পালনের মূল উদ্দেশ্যই হল সমাজ থেকে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে তীব্র জনসচেতনতা তৈরি করা এবং সব দেশকে একত্রিত হয়ে এই অমানবিক প্রথা নির্মূল করার অঙ্গীকার করা।

শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার অধিবেশনে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রাখেন সিয়েরা লিওনের ফার্স্ট লেডি ডঃ ফতিমা মাদা বিয়ো। তিনি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা এবং প্রতিটি শিশুকন্যার ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা কেবল নির্দিষ্ট কোনো দেশের নয়, বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক সমাজের যৌথ ও সামগ্রিক দায়বদ্ধতা। তাঁর কথায়, পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার নেপথ্যে কোনো না কোনো শিশুর গোটা জীবন জড়িয়ে থাকে। সেগুলি নিছক কিছু তথ্য বা সংখ্যা নয়, বরং একটি শিশুর অমূল্য স্বপ্ন এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রশ্ন। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বয়সে যে কন্যাসন্তানটির স্বপ্ন দেখার কথা, সে হয়তো আজ বলপূর্বক বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার এই কোমল বয়সে তাকে কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে অসমবয়সি কঠোর দায়িত্ব।

ফতিমা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র কথার কথা বলে বা আন্তর্জাতিক দিবস পালন করলেই বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপ চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী ও কনিষ্ঠ আইনব্যবস্থা, সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং ব্যাপক শিক্ষা প্রসার। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আইন প্রণয়ন করা এক বিষয় আর তার সঠিক বাস্তবায়ন করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য জটিল সমস্যা রয়েছে, ঠিক তেমনই বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দমন করা দরকার।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক শিশুর অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘Just Rights for Children’-এর বিশিষ্ট আইনজীবী ভুবন রিভু এই মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে গোড়া থেকেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। চলতি বছরের মার্চ মাসেই তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে বাল্যবিবাহ নির্মূলকরণ দিবস পালনের জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ভারতের প্রায় ২৫ কোটি নাগরিক বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে মাথায় রেখেই আন্তর্জাতিক শিশু ও জোরপূর্বক বিবাহ প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালনের সুপারিশ করা হয়েছিল, যাতে অবশেষে সিলমোহর দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ।