১৯১২ কোটি টাকা ক্যাশ আর ৬০ হাজার একর জমি! পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সম্পত্তির পরিমাণ জানলে চোখ কপালে উঠবে!

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে ঘিরে দেশ তথা সারা বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের আবেগ ও বিশ্বাসের কোনো শেষ নেই। শতাব্দী প্রাচীন এই মহাতীর্থের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যের পাশাপাশি এবার সামনে এল এর বিপুল আর্থিক সম্পদের এক অবিশ্বাস্য চিত্র। শ্রী জগন্নাথ টেম্পল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা SJTA-র প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং ফিক্সড ডিপোজিট মিলিয়ে জগন্নাথ মন্দিরের মোট আর্থিক সঞ্চয়ের পরিমাণ এক লাফে প্রায় ১ হাজার ৯১২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। শুধু নগদ অর্থ বা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সই নয়, এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে মন্দিরের নামে থাকা ৬০ হাজারেরও বেশি একর বিশাল পরিমাণ জমি। মন্দিরের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কোষাগারের এই ঐতিহাসিক হিসাব প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ভক্তমহলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, গত ৩১ অগস্ট পর্যন্ত মন্দিরের শুধুমাত্র ফিক্সড ডিপোজিট বা স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৮১১.১০ কোটি টাকা। এই বিশাল পরিমাণ অর্থের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৩১১.১০ কোটি টাকা অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে দেশের বিভিন্ন প্রথম সারির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে জমা রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রদেয় ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ কর্পাস ফান্ড। মন্দিরের দৈনন্দিন খরচ, পুজো পাঠ এবং বিভিন্ন উৎসব পরিচালনার জন্য একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আলাদা করে অর্থ রাখা হয়। সেভিংস, কারেন্ট এবং ফ্লেক্সি অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে সেই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০০.৭১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মন্দিরের ব্যাঙ্কে থাকা মোট নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১,৯১২ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে পৌঁছেছে।
আর্থিক সম্পদের পাশাপাশি পুরীর মন্দিরের স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণও রীতিমতো তাক লাগানোর মতো। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে মন্দিরের নামে নিবন্ধিত রয়েছে মোট ৬০ হাজার ৮২১ একর জমানি জমি। যার সিংহভাগই অবস্থান করছে ওড়িশা রাজ্যের সীমানার মধ্যে। ওড়িশার ২৪টি সুনির্দিষ্ট জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই মন্দিরের জমির পরিমাণ প্রায় ৬০,৪২৬ একর। শুধু নিজের রাজ্যেই নয়, ওড়িশার বাইরে ভারতের আরও অন্তত ছয়টি ভিন্ন রাজ্যেও জগন্নাথ দেবের নামে বহুমূল্য সম্পত্তি ও জমি রয়েছে। মোট প্রায় ৩৯৫ একর এই জমিও ছড়ানো রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশের মতো জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এত বিশাল পরিমাণ অর্থের উৎস কী? পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আয়ের বহুবিধ ও স্থায়ী উৎস রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ভক্তের দেওয়া দান, দক্ষিণা এবং প্রণামী এই আয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এর পাশাপাশি মন্দিরের মালিকানাধীন হাজার হাজার একর জমি থেকে আসা লিজের টাকা, বিভিন্ন খনি ও পাথরের খাদান থেকে সংগৃহীত রাজস্ব, ফিক্সড ডিপোজিট থেকে প্রাপ্ত মোটা অঙ্কের সুদ এবং বিভিন্ন সরকারি ও দাতব্য অনুদানও মন্দিরের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গণ্য হয়। মন্দিরের দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্ত খরচ সাধারণত এই মূল তহবিল থেকেই মেটানো হয়। ভবিষ্যতের যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সর্বদা নির্দিষ্ট কর্পাস এবং ফাউন্ডেশন ফান্ডে সুরক্ষিত রাখা হয়।
আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মন্দির প্রশাসন প্রযুক্তির ব্যবহারেও বেশ অনেকটা এগিয়েছে। দেশ-বিদেশের ভক্তদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে রথযাত্রার ঠিক আগে ‘সমর্পণ’ (Samarpan) নামক একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ভক্তরা সরাসরি অনলাইনে অনুদান পাঠাতে পারছেন। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, অগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৫৬.৭১ লক্ষ টাকা জমা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মন্দিরের মূল হুন্ডিতে প্রতিদিন ঠিক কত টাকা দান হিসেবে জমা পড়ছে, তার নিখুঁত হিসাবও ভক্তদের সামনে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। মন্দিরের অফিসিয়াল নোটিস বোর্ড এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়মিত সেই স্বচ্ছ তথ্য আপডেট করা হয়।
সম্পত্তির এই বিরাট খতিয়ান প্রকাশের পাশাপাশি বর্তমানে সবথেকে বেশি যে বিষয়টি বিশেষ নজর কেড়েছে, তা হলো মন্দিরের ঐতিহাসিক রত্নভাণ্ডার। শত শত বছর ধরে দেশ-বিদেশের ভক্তদের নিবেদিত বহুমূল্য রত্নালংকার, খাঁটি সোনা, হিরে এবং অন্যান্য প্রাচীন রত্ন এই রত্নভাণ্ডারে পরম যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৪৮ বছর বা প্রায় পাঁচ দশক পর এই রত্নভাণ্ডারের সম্পূর্ণ সামগ্রী সরেজমিনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে একটি নতুন তালিকা তৈরির ঐতিহাসিক কাজ বর্তমানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে। মন্দির প্রশাসনের স্পষ্ট বক্তব্য, এই বিপুল আর্থিক সম্পত্তি এবং রত্নভাণ্ডারের বিশদ তথ্য প্রকাশ্যে আনার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা শতভাগ নিশ্চিত করা এবং মহামান্য জগন্নাথদেবের পবিত্র সম্পত্তি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা।