ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের ১২০০ কোটি গেল কোথায়? জলের নিচে ডুবে শহর, বানভাসি বাংলা!

পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল জুড়ে ফের ভয়াবহ প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিভিন্ন জলাধার থেকে অতিরিক্ত জল ছাড়ার কারণে শিলাবতী নদীর জলস্তর হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেই নদীর উপচে পড়া জলের তোড়েই কার্যত জলের নিচে তলিয়ে গেছে গোটা ঘাটাল শহর। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য সড়ক থেকে শুরু করে অগণিত সাধারণ রাস্তাঘাট, কৃষকদের খেতের ফসল এবং অজস্র দোকানপাট। প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ঘাটাল পৌরসভার মোট দশটি ওয়ার্ড বর্তমানে জলমগ্ন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শহরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় যাতায়াতের জন্য মানুষ বাধ্য হয়ে ডিঙি নৌকার সাহায্য নিচ্ছেন। স্থানীয়দের মনে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে যে, আগামী দিনে যদি বৃষ্টির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়, তবে তাঁদের দুর্ভোগের অন্ত থাকবে না।

বছরের পর বছর ধরে ঘাটালবাসীর চিরন্তন এই জলযন্ত্রণা এবং বন্যা সমস্যা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে বিশিষ্ট তারকা বিধায়ক দেবের মুখেও। তবে কোটি কোটি টাকার এই মেগা প্রজেক্টের কাজ শুরু হলেও তা এতটাই কচ্ছপ গতিতে এগিয়েছে যে, আদতে ঘাটালবাসীর কোনো স্থায়ী সুরাহা হয়নি। বছরের পর বছর ধরে বর্ষার মরশুমে ছবিটা একই থেকে যায়। সম্প্রতি রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে একটি অত্যন্ত বড় ঘোষণা করেছিল। তৎকালীন সময়ে বাজেট পেশ করার সময় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান দ্রুত বাস্তবায়িত করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময় ঘাটালবাসীকে আশার আলো দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, প্রতি বছর ঘাটালে যে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা চিরতরে বন্ধ করতে এই বড় অঙ্কের অর্থ বিশেষ ভূমিকা নেবে। সেই কারণেই চলতি বছরের বাজেট বক্তৃতার অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই বিশাল অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা সত্ত্বেও চলতি বছরেও ঘাটালের প্লাবন পরিস্থিতির যে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, তা বর্তমানের ভয়াবহ ছবি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ঘাটাল একা নয়, বরং প্রকৃতির মারের জেরে গোটা রাজ্য জুড়েই এক বানভাসি ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। লাগাতার ও অবিরাম বর্ষণের জেরে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে তিলোত্তমা রাজধানী কলকাতা। বুধবারের ভারী বর্ষণের রেশ কাটতে না কাটতে বৃহস্পতিবারও কলকাতার আকাশ সারাদিন মেঘাচ্ছন্ন থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতির ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা মূলত নিম্নচাপের অবস্থানের পরিবর্তনের কারণেই ঘটেছে। যে শক্তিশালী নিম্নচাপের প্রবল প্রভাবে বিগত কয়েকদিন ধরে কলকাতা সহ সমগ্র দক্ষিণবঙ্গজুড়ে বৃষ্টির তাণ্ডব বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল, সেটি বর্তমানে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রদেশের দিকে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে বাংলার ওপর থেকে ওই নিম্নচাপের প্রত্যক্ষ ও সরাসরি প্রভাব আপাতত অনেকটাই কমে এসেছে।

তা সত্ত্বেও রাজ্যবাসীর কপালে এখনই পুরোপুরি স্বস্তির কোনো লক্ষণ নেই। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই নিম্নচাপ এবং তার সঙ্গে যুক্ত উচ্চবায়ুস্তরের সক্রিয় অক্ষরেখার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ আরও বেশি শক্তিশালী ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলস্বরূপ কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় আগামী দিনেও দফায় দফায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। কলকাতার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া এবং পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলিতেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বুধবারের মতো ব্যাপক ও অবিরাম বৃষ্টি হয়তো সব জায়গায় একসঙ্গে হবে না, তবুও থেমে থেমে বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এর ফলে শহরের নিচু এলাকাগুলিতে পুনরায় জল জমার প্রবণতা, জলমগ্ন রাস্তাঘাট এবং স্বাভাবিক যান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।