একসাথেই গোনা হবে ১৪টি বুথের ইভিএম! নির্বাচনে রক্তক্ষয়ী হিংসা থামাতে সুপ্রিম কোর্টে কি হতে চলেছে বড় রায়?

ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোট পরবর্তী হিংসা এবং সাধারণ ভোটারদের ওপর নেমে আসা রাজনৈতিক নিপীড়ন রোধ করতে এবার সুপ্রিম কোর্টে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী বা পরাজিত প্রার্থীরা যাতে নির্দিষ্ট কোনো এলাকার ভোটারদের চিহ্নিত করে বদলা নিতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে ইভিএমের ভোট গণনায় ‘টোটালাইজার’ (Totaliser) নামক একটি বিশেষ সফটওয়্যার বা মেশিন ব্যবহারের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা এই জনস্বার্থ মামলাটি নিয়ে বর্তমানে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিখ্যাত আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায়ের দায়ের করা এই মামলায় দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বুথভিত্তিক ভোট গণনা হওয়ার কারণে প্রার্থীরা পরিষ্কার বুঝতে পারেন কোন এলাকার মানুষ তাঁকে ভোট দেয়নি বা কম ভোট দিয়েছে। এর ফলেই নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ভোটারদের ওপর বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় শিবিরের রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকরা চড়াও হয়। শুরু হয় বর্বরোচিত হামলা ও প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। সাধারণ ভোটারদের এই চরম আতঙ্ক ও ভীতি থেকে চিরতরে মুক্তি দিতেই টোটালাইজার ব্যবহারের দাবি জানানো হয়েছে। এই বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্তত ১৪টি বুথের ইভিএমের ভোট একত্রে বা একত্রিত করে গণনা করা সম্ভব, যার ফলে নির্দিষ্ট কোনো বুথের আলাদা ফলাফল প্রকাশ্যে আসবে না এবং ভোটারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সহজ হবে।
এই জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করেছে এবং এই বিষয়ে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানতে চেয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে শীর্ষ আদালতে ইতোমধ্যে একটি বিস্তারিত হলফনামা জমা দিয়েছে। কমিশনের যুক্তি, ২০১৬ সালে গঠিত একটি বিশেষ মন্ত্রী গোষ্ঠী বা গ্রুপ অফ মিনিস্টার্স এই প্রস্তাবটি আগেই খারিজ করে দিয়েছিল। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের দাবি, টোটালাইজার ব্যবহার করে একাধিক বুথের ভোট একসঙ্গে গণনা করতে হলে ১৯৫০ এবং ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬১ সালের নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে বড় ধরনের আইনি সংশোধন আনতে হবে, যা আইন প্রণয়নকারী সংসদ এবং সরকারের একচেটিয়া এক্তিয়ার।
তবে নির্বাচন কমিশনের এই যুক্তি মানতে নারাজ আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ। তাঁদের মতে, আইন সংশোধন করার যে অজুহাত কমিশন দিচ্ছে তা কোনো insurmountable বা অসম্ভব বিষয় নয়। অতীতে আইন সংশোধন করেই তো দেশে প্রথম ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন চালু করা হয়েছিল, যা ভারতের নির্বাচন ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী ও সফল সংস্কার। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের জোরালো মত, যদি টোটালাইজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে একাধিক বুথের ফলাফল একসঙ্গে প্রকাশের ব্যবস্থা করা যায়, তবে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হিংসাত্মক হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে কেন্দ্র সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট এই সংবেদনশীল বিষয়ে কী চূড়ান্ত রায় দেয়।