হিমালয়ে সর্বনাশা জলবায়ু বিপর্যয়! জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হতেই নেপালের অর্থনীতিতে চরম ধস?

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ও পরিকাঠামো খাতের নিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জলবিদ্যুৎকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব এবং নির্ভরযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ, বরফাবৃত চূড়া এবং পাহাড়ি ঢালের ভৌগোলিক চরিত্র অত্যন্ত দ্রুত বদলাতে শুরু করায় এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিই এখন এক মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক রোষ শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংকট নয়, বরং গোটা হিমালয়জুড়ে গড়ে ওঠা জলবিদ্যুৎ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের মেঘ ঘনাচ্ছে।
বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো, পরিবেশ দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যেই নেপাল, ভুটান, ভারত ও চিন সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহগুলি অত্যন্ত দ্রুত গলতে শুরু করেছে, বৃষ্টিপাতের চিরাচরিত ধরন বদলে গেছে এবং পাহাড়ের আলগা ঢালগুলি ক্রমশ আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এর ফলে আকস্মিক হিমবাহ-হ্রদের জলস্ফীতি, আকস্মিক ভূমিধস, পাহাড়ি ঢাল থেকে বরফ ও পাথরের স্তূপ খসে পড়া এবং নদীর জলস্তর হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার মতো চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই ধরনের দুর্যোগের মূল বিপদ কেবল হিমবাহ গলে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বিশাল বরফ ও পাথরের ধস যখন সরাসরি নদীর জলধারায় গিয়ে পড়ে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে প্রলয়ঙ্করী জলের ঢেউ সৃষ্টি করে। সেই উন্মত্ত জলপ্রবাহ পাহাড়ি উপত্যকার সরু পথ বেয়ে নিমেষেই লোকালয়ে আছড়ে পড়ে এবং ভয়াবহ বন্যা ও সর্বনাশা ধ্বংসলীলা ডেকে আনে। বিশেষ করে হিমালয়ের দুর্গম ও সরু উপত্যকাগুলিতে যেখানে একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেখানে এই ধরনের ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সাম্প্রতিক এই বিপর্যয়ে নেপালের উদীয়মান জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো এক বিরাট ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে দেশটির প্রায় ১২টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মোট কার্যকর উৎপাদন ক্ষমতা ৪০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কেবল একটিমাত্র নদী অববাহিকাতেই প্রায় ২০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প অবস্থিত থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ চরম আকার ধারণ করেছে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে প্রায় ১৩০ বিলিয়ন নেপালি রুপি বা প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই বিশাল ধাক্কার ফলে নেপালের উচ্চাভিলাষী জলবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা অন্তত পাঁচ থেকে ছয় বছর পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।
উল্লেখ্য, জলবিদ্যুৎ নেপালের জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি করে প্রায় ৩০ গিগাওয়াট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিবেশী দেশগুলিতে রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে এবং বাংলাদেশও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় শুরু করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জলবিদ্যুৎ খাতের ওপর নেপালের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে এই সংকট শুধু নেপালের একার নয়, বরং গোটা হিমালয় জুড়েই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে এই সংবেদনশীল অঞ্চলে ৪০ গিগাওয়াটের বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চালু রয়েছে এবং আরও প্রায় ২০০ গিগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্প বিভিন্ন পরিকল্পনাধীন পর্যায়ে রয়েছে।
এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। পরিবর্তে, ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রতিটি প্রকল্পের নকশা এবং নির্মাণপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। নদীর একেবারে কোল ঘেঁষে পাওয়ারহাউস তৈরি করার প্রবণতা বাদ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া পাহাড়ি ধস ও আকস্মিক পাথরের প্রবেশ ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর গেটযুক্ত টানেল নির্মাণ এবং আগাম বিপর্যয়ের পূর্বাভাস ও নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলতে হবে। হিমালয়ের সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় তাই নিছক একটি জলরোষের ঘটনা নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের সমস্ত জলবিদ্যুৎ পরিকল্পনার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। জলবিদ্যুৎকে যদি আগামী দিনের সবুজ শক্তির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে অতীতের গতানুগতিক আবহাওয়ার হিসাব বাদ দিয়ে দ্রুত বদলে যাওয়া অনিশ্চিত হিমালয়ের ভবিষ্যৎ রূপকে মাথায় রেখেই উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা সাজাতে হবে।