যে দেশ বিশ্বকে তেল বেচে, আজ তারাই ভারতের দ্বারস্থ! মস্কোকে বাঁচানোর নেপথ্যে কোন বড় রহস্য?

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক অভূতপূর্ব উলটপুরাণ দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও আজ রাশিয়ার জ্বালানি বাজার রীতিমতো ধুঁকছে। ইউক্রেনের লাগাতার ও ধ্বংসাত্মক ড্রোন হামলার জেরে পুতিনের দেশের তেল শোধনাগারগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে বাধ্য হয়েই বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে মস্কোকে।
ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় কোণঠাসা রাশিয়া:
সাম্প্রতিক মাসগুলিতে, বিশেষ করে জুলাই ও আগস্ট মাসে রুশ জ্বালানি কাঠামোর ওপর কম করে হলেও ৩২টি বড়সড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এই জোড়া ফলার হামলায় রাশিয়ার বহু তেল শোধনাগার অকেজো হয়ে পড়েছে এবং ঘরোয়া বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জ্বালানির তীব্র সংকট সামাল দিতে বাধ্য হয়ে রাশিয়া পেট্রোল এবং ডিজেল রপ্তানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
ভারতের দিকে সাহায্যের হাত:
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ভারত। এনার্জি মার্কেট অ্যানালাইসিস ফার্ম ‘ভর্টেক্সা’ (Vortexa)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসে রাশিয়ার সমুদ্রপথে পেট্রোল আমদানি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে রেকর্ড ১.২৫ লক্ষ ব্যারেল প্রতি প্রতিদিনের স্তরে পৌঁছেছে। সামগ্রिकভাবে পুরো আগস্ট মাসে এই আমদানির পরিমাণ ৪.৭০ লক্ষ টন ছুঁতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
মিডিয়া রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় শোধনাগারগুলি গত দুই মাসের মধ্যেই রাশিয়াকে প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল পেট্রোল সরবরাহ করেছে। এর নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে গুজরাটের ভদিনার (Vadinar) শোধনাগার, যা পরিচালনা করে ‘নায়রা এনার্জি’। উল্লেখ্য, এই কোম্পানির প্রায় ৫০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল জায়ান্ট ‘রোসনেফ্ট’-এর হাতে।
রাশিয়ার তেল ঘুরিয়ে রাশিয়ার কাছেই:
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমীকরণের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০২২ সালের পর থেকে ভারত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত চড়া ছাড়ে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে কাঁচা বা ক্রুড অয়েল কেনা অব্যাহত রেখেছে। জুন ও জুলাই মাসে ভারত প্রতিদিন গড়ে ২৬ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি কাঁচা তেল আমদানি করেছে রাশিয়ার কাছ থেকে, যা ভারতের মোট আমদানির অর্ধেকেরও বেশি।
বাস্তব চিত্র বলছে, ভারত এই রুশ ক্রুড অয়েল নিজেদের শোধনাগারে পরিশোধন করে পেট্রোল ও ডিজেলের মতো ফাইনাল প্রোডাক্ট তৈরি করে। ফলে ঘুরপথে ভারত যে পেট্রোল এখন মস্কোকে রপ্তানি করছে, তার একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে সেই রুশ কাঁচা তেল থেকেই। অর্থাৎ, যুদ্ধের বাজারে একদিকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা এবং অন্যদিকে ভারতীয় শোধনাগারগুলির কার্যকারিতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজ রাশিয়ার অর্থনীতির প্রধান ‘লাইফলাইন’ হয়ে উঠেছে নয়াদিল্লি।