রিলিজের পরেই ডিলিট করা হচ্ছে নেগেটিভ রিভিউ! যশ অভিনীত ‘টক্সিক’ নিয়ে কোন বড় কেলেঙ্কারি সামনে এল?

আলফা মেল! হ্যাঁ, রণবীর কাপুরের ‘অ্যানিম্যাল’ ছবির পর থেকে এই শব্দের সঙ্গে এখন প্রায় পরিচিত সবাই। সঙ্গে যোগ হয়েছে টক্সিক পুরুষত্ব। পেশিবহুল চেহারা, অগোছালো সাজ, ডাকাবুকো, প্রাণ হারানোর ভয় ছাড়া অলটাইম অ্যাকশনের জন্য তৈরি। রক্ত, ব্যথা, এসব তো একেবারেই সেই পুরুষের হাতের ময়লা। কয়েক বছর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এই টক্সিক ঝড় ইতিমধ্যেই বাজার কাঁপাচ্ছে। সেই দক্ষিণী সিনে পরিচালক সন্দীপের বলিউড এন্ট্রি রণবীরের অ্যানিম্যাল। তারপর কিছুদিন আগেই বলিউড দেখেছে আদিত্য ধর ও রণবীর সিংয়ের অ্যাকশন প্যাকড ‘ধুরন্ধর’। মোটামুটি গত কয়েক বছরের বলিউড বক্স অফিস দেখলে ধরা পড়ে টক্সিক ট্রেন্ডই হিট হওয়ার সূত্র। কিন্তু অতিরিক্ত যৌনতা, অতিরিক্ত অ্যাকশন, রক্তকে সামনে রেখে, সিনেমার মূল ভিত্তি গল্প কি হারিয়ে যাচ্ছে?

২৬ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে সিনেমা হলে যশ অনুরাগীদের উচ্ছ্বাসের দৃশ্য। ফিল্ম ক্রিটিকরা মনে করছেন, ইদানিং ছবি হিট করানোর নেপথ্যে এই উচ্ছ্বাসের ভিডিও অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। যশের ‘টক্সিক’-এর ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এরই মাঝে হঠাৎই নানা ইউটিউবারদের নেগেটিভ রিভিউয়ের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই, নড়েচড়ে বসেছে টক্সিক টিম। বেছে বেছে ইউটিউবারদের শনাক্ত করে, নেগেটিভ রিভিউ মুছে দেওয়ার নির্দেশ নাকি দিয়েছে এই ছবির টিম। অন্তত, অভিযোগ তেমনই। ছবি যদি ভালো হয়, তাহলে এমন পদক্ষেপের কী দরকার—এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে সোশাল মিডিয়ায়।

ছবির গল্প ও চরিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, যশের কাহিনির বিন্যাস নিয়ে যথাসম্ভব কম বলাই শ্রেয়, কারণ ট্রেলারই অনেক কিছু স্পষ্ট করে দিয়েছে। ছবিতে রায়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন যশ, যে চরিত্রটি সংঘাত ও হিংস্রতার সঙ্গে বেশ সাবলীল। শৈশব থেকে তাকে আগলে রাখা বোন গঙ্গা (নয়নতারা) তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তার লক্ষ্য গোটা বিশ্ব শাসন করে ‘সিকন্দার’ হয়ে ওঠা। রায়ার অন্ধকার জগতে একে একে প্রবেশ ঘটে সালভাদোর (ড্যারেল ডি’সিলভা), তার প্রেমিকা (হুমা কুরেশি) এবং তার ভাইয়ের (অক্ষয় ওবেরয়)। এর মাঝেই হাজির হয় সার্কাস পরিচালনাকারী ‘জলপরী’ নাদিয়া (কিয়ারা আদভানি)। রায়া ও নাদিয়ার মধ্যে তীব্র প্রেম গড়ে ওঠে, আর তার পরই হাজির হয় সেই চেনা ‘অধরা প্রেম’ এবং তার সঙ্গে যুক্ত সব নাটকীয়তা।

ছবিটির মূল চালিকাশক্তি অবশ্যই যশ। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ঢেকে রাখা কঠিন এবং ‘টক্সিক’ নির্মাতারা তাঁর এই জনপ্রিয় ভাবমূর্তির সদ্ব্যবহার করেছেন। তিনি এখানে এমন এক বেপরোয়া পুরুষ, যার নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই এবং মৃত্যুকে যে খেলাচ্ছলে তুচ্ছ করতে পারে। সিগারেট ধরানোর প্রতিটি দৃশ্যে তিনি অনবদ্য—উড়ন্ত স্ফুলিঙ্গ, জামার হাতায় আগুন আর স্লো-মোশনের ক্যারিশমা দর্শকদের নজর কাড়তে বাধ্য। তবে রায়ার চরিত্রের আরেকটি দিকও আছে। নিজের অপরাধবোধ তাকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়—যেন ম্যাকবেথের মতো এক চেতনা, যেখানে সে বোঝে তার হিংস্রতার পরিণতি একদিন তাকে গ্রাস করবে। কিয়ারা আদভানিও শোকে ব্যাকুল এক নারীর চরিত্রে যথেষ্ট নজর কেড়েছেন। অন্যদিকে নয়নতারা, তারা সুতারিয়া, হুমা কুরেশি এবং অক্ষয় ওবেরয়ের স্ক্রিন টাইম কিছুটা সীমিত হলেও সবাই নিজের জায়গায় সফল।

‘টক্সিক’ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার আরেকটি বড় কারণ এর নির্মাণশৈলী। একজন নারী পরিচালকের কাছ থেকে নারীদের উপস্থাপন ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যে সংবেদনশীলতা আশা করা যায়, এই ছবিতে তা কিছুটা অনুপস্থিত। পুরো ছবিটি মূলত ‘মেল গেইজ’ বা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নির্মিত। নারী চরিত্রগুলোকে অধিকাংশ সময়ই কেবল আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ বা প্রধান পুরুষ চরিত্রের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। নির্মাতা হিসেবে গীতু মোহনদাস তাঁর দর্শকদের চাহিদা বোঝেন, কিন্তু সব মিলিয়ে ছবিটিকে গীতু মোহনদাসের চেয়ে ‘যশের ছবি’ বলেই বেশি মনে হয়। একই কথা প্রযোজ্য ছবিতে দেখানো রক্তারক্তি ও হিংস্রতার ক্ষেত্রেও। কাটা মাথা, শাওয়ারে ঝুলন্ত লাশ কিংবা শুভেচ্ছা হিসেবে কেটে রাখা হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো দৃশ্যগুলো কোনো সূক্ষ্মতার ধার ধারে না। স্কেল বিশাল হলেও কিছু সিজিআই (CGI) দৃশ্য কৃত্রিম ঠেকে, যা সংঘাতের তীব্রতাকে খানিকটা কমিয়ে দেয়। ছবির সংলাপগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রতিটি বাক্যই প্রেক্ষাগৃহে সিটি বা করতালি আদায় করতে পারে। বলা বাহুল্য, সেই কৌশল কাজও করেছে; সিনেমা হলের দর্শক এই দৃশ্যগুলোতে মেতে উঠেছেন। তবুও প্রশ্ন ওঠে, শুধু অ্যাকশন ভরা ফ্রেম কি একটি ছবির চালিকা শক্তি হতে পারে? গল্প বলে কি আর কিছুই থাকবে না!