নেপালে প্রলয়ঙ্করী হড়পা বান! লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুমিছিল, এখনও নিখোঁজ ১৩৩ ভারতীয় সহ দেড় হাজারের বেশি পর্যটক

প্রকৃতির এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও নির্মম রূপ দেখল নেপাল। তিব্বত থেকে নেমে আসা ভোতেকোশি নদীর আকস্মিক জলস্তর বৃদ্ধি এবং ভয়াল হড়পা বানে তছনছ হয়ে গেছে দেশটির বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা। সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬০ জনে। অন্যদিকে, এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৫০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই বিপর্যয়ের ফলে সবথেকে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে। জানা গিয়েছে, নেপালে ঘুরতে যাওয়া ১৩৩ জন ভারতীয় নাগরিকের এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি। শুধু তাই নয়, বহু বিদেশি পর্যটকও এই আকস্মিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন। যার মধ্যে আমেরিকার ৪৭ জন, ব্রিটেনের ৩৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন এবং কানাডার ২৪ জন নাগরিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূকম্পনের স্মৃতিকে উসকে দেওয়া এই আকস্মিক জলপ্রলয়ে গোটা নেপালজুড়ে চরম আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার সকালে আবহাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল এবং ঝলমলে রোদের আকাশ দেখেই দিন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে নটা নাগাদ হঠাৎ করেই পাহাড়ের দিক থেকে এক তীব্র গুড়গুড় শব্দ শুনতে পান তাঁরা। বাইরে বেরিয়ে মানুষ দেখেন, বিস্ফোরণের ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে দানবীয় কাদা-মাটির ঢেউ ও জলস্রোত হুড়মুড়িয়ে নেমে আসছে লোকালয়ের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে ভোতেকোশির সর্বনাশা স্রোত রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানসহ নেপালের মোট ছয়টি জেলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভেসে গিয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেতু। বিপর্যয়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেনি, তবে হতাহতের সংখ্যা যে ব্যাপক, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেছেন।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স (টুইটার) হ্যান্ডলে নিজের বার্তা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। কঠিন এই সময়ে ভারতের ১৮ কোটি মানুষ নেপালের ভাই-বোনদের পাশে শক্তভাবে রয়েছে এবং নেপালকে সব ধরনের মানবিক সাহায্য দিতে নয়াদিল্লি প্রস্তুত। ভারতের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ সামরিক বিমান সি-১৩০জে (C-130J) এর মাধ্যমে প্রায় ১০ টন ওজনের জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও জীবনদায়ী চিকিৎসা সরঞ্জাম কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, উদ্ধার ও ত্রাণকাজে নেপাল প্রশাসনের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে ভারতের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF)।
এদিকে, তিব্বত থেকে নেমে আসা ভোতেকোশি নদী নেপালের ছয়টি জেলা অতিক্রম করে বিহারমুখী গণ্ডক নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নেপাল থেকে নেমে আসা এই অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত জলের কারণে ইতিমধ্যেই ফুঁসতে শুরু করেছে গণ্ডক নদী। যেকোনো মুহূর্তে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় চরম সতর্কতা জারি করেছে বিহার প্রশাসন। অন্যদিকে, এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ভারতেও। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশানুযায়ী, রাজ্যের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সাহায্যে কলকাতার ভবানী ভবনে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খুলেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। নেপালে বেড়াতে গিয়ে যেসব ভারতীয় পর্যটক আটকে পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের পরিবারগুলোকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান এবং নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে। কন্ট্রোল রুমের পক্ষ থেকে বিশেষ হেল্পলাইন নম্বরও জারি করা হয়েছে। সবমিলিয়ে, প্রকৃতির এই অপরিসীম রোষানল ও ধ্বংসলীলা সমগ্র উপমহাদেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।