বেসরকারি হাসপাতালের টাকার লোভেই কি প্রাণ গেল শিশুদের? মালদা মেডিক্যাল কলেজের মর্মান্তিক ঘটনায় চাঞ্চল্য!

আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং পরিকাঠামো সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য মহলে এক নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে। মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ‘মাতৃমা’ নামক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব ভবনে গত অগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে একদিনের ব্যবধানে মোট ১০ জন নবজাতকের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মৃত্যুর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার বা আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিয়মমাফিক সরকারি পোর্টালে জন্ম ও মৃত্যুর দৈনিক রিপোর্ট আপলোড হতেই বিষয়টি সরাসরি স্বাস্থ্য ভবনের নজরে আসে এবং নড়েচড়ে বসে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।
১১১২ শয্যা বিশিষ্ট এই মালদা মেডিক্যাল কলেজের প্রসূতি ও সদ্যোজাতদের চিকিৎসার জন্য পৃথক পরিকাঠামো থাকলেও এই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে তড়িঘড়ি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বিশদ ও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—মৃত ১০ জন নবজাতকের মধ্যে অন্তত ৮ জন শিশুকে বিভিন্ন বাইরের হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে মালদা মেডিক্যালে রেফার করা হয়েছিল। মেডিক্যালের চিকিৎসকদের একাংশের দাবি, নিম্নবিত্ত পরিবারের গর্ভবতীরা সরকারি হাসপাতালে এলেও মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা মূলত বেসরকারি নার্সিংহোমের ওপর ভরসা করেন। অভিযোগ রয়েছে, বহু বেসরকারি হাসপাতাল অতিরিক্ত উপার্জনের লোভে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সুস্থ নবজাতকদেরও ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট বা সিসিইউ-তে আটকে রেখে চিকিৎসা চালায়।
এর ফলে অনেক সময় সদ্যোজাতদের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। যখন দেখা যায় শিশুটির বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ এবং পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই তড়িঘড়ি তাদের সরকারি মেডিক্যালে রেফার করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এই আটটি শিশুর ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছে বলে চিকিৎসকদের অনুমান, যার ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকদের আর করার কিছু থাকে না।
পুরো বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন মালদা মেডিক্যালের সহকারী অধ্যক্ষ তথা হাসপাতাল সুপার প্রসেনজিৎ বর। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সম্প্রতি মালদা মেডিক্যালে একদিনে ১০টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং তাদের মৃত্যুর কারণগুলিও সম্পূর্ণ আলাদা ও জটিল। মৃতদের মধ্যে কয়েকটি শিশুর জন্মলগ্নে ওজন অত্যন্ত কম ছিল, কারো বা জন্মগত নিঃশ্বাসের সমস্যা বা বার্থ অ্যাসফিক্সিয়া ছিল, আবার কেউ কেউ সেপটিসিমিয়া ও জন্ডিসের মতো মারাত্মক উপসর্গে আক্রান্ত ছিল। তিনি আরও জানান যে স্বাস্থ্য ভবন থেকে এই বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল এবং হাসপাতাল ইতিমধ্যেই প্রাথমিক রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছে, খুব শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের রিপোর্টও জমা দেওয়া হবে। উল্লেখ্য, ১০ জন শিশুর মধ্যে ৮ জন বাইরে থেকে রেফার হয়ে এলেও বাকি দু’জন এই হাসপাতালেই জন্মগ্রহণ করেছিল। মালদা মেডিক্যালে প্রতিদিন গড়ে চার শিশুর মৃত্যু স্বাভাবিক ধরা হলেও, একদিনে ১০ শিশুর এই প্রাণহানি প্রায় দেড় দশক আগের শিশুমৃত্যুর স্মৃতি উসকে দিয়েছে।