ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই! নীতি আয়োগের চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে ফাঁস ভারতের উচ্চশিক্ষার ভয়ঙ্কর করুণ ছবি!

দেশের উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদার মধ্যে এক গভীর ও উদ্বেগজনক অসামঞ্জস্যের চিত্র তুলে ধরল নীতি আয়োগ। সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের এক নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ‘রিইমাজিনিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত ২০৪৭’ (Reimagining Skilling for Viksit Bharat 2047) শীর্ষক এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস সম্পূর্ণ সেকেলে হয়ে পড়েছে। শিল্পের আধুনিক বিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। ফলস্বরূপ, হাজার হাজার তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট অর্জন করেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৮.২৫ শতাংশ স্নাতক তাঁদের প্রকৃত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা মানানসই পদে নিযুক্ত হতে পেরেছেন। শিক্ষিত যুবসমাজ তথা গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বাড়তে থাকা এই উচ্চ বেকারত্বের হার দেশের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, যেখানে জাতীয় বেকারত্বের সামগ্রিক হার ৩.২ শতাংশ, সেখানে মোট স্নাতকদের মধ্যে বেকারের হার ১৩ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধুমাত্র মহিলা স্নাতকদের ক্ষেত্রে এই বেকারত্বের হার এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.৪ শতাংশে।
প্রতিবেদনে প্রচলিত সাধারণ ডিগ্রি কোর্সের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের অত্যধিক অন্ধ ঝোঁক এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে এই কোর্সগুলির অত্যন্ত দুর্বল সংযোগের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তি হওয়া মোট ৩.৪ কোটি পড়ুয়ার মধ্যে একা ১.১৩ কোটি পড়ুয়া শুধুমাত্র সাধারণ বিএ (BA) কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল বিএ, বিএসসি (BSc) এবং বিকম (BCom)—এই তিনটি প্রথাগত কোর্সে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ইতিমধ্যেই ২ কোটির গণ্ডি পার করে ফেলেছে। নীতি আয়োগের মতে, একটি বিশাল সংখ্যক পড়ুয়া মূলত সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসার ন্যূনতম যোগ্যতামান বজায় রাখার তাগিদেই এই ডিগ্রিগুলি অর্জন করছেন। যার একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা গিয়েছিল সম্প্রতি; ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের মধ্যে মাত্র ৫৫ হাজার শূন্যপদের সরকারি চাকরির জন্য দেশের প্রায় ১.৮৬ কোটি পরীক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন।
এই গভীর কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করতে ডিগ্রি কলেজ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ITI) এবং পলিটেকনিকগুলির সার্বিক পঠনপাঠন ব্যবস্থাকে আমূল নতুন করে সাজানোর ওপর জোর দিয়েছে নীতি আয়োগ। এই সংকট উত্তরণে শিল্পখাতের অধিকতর ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেল চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথাগত সাধারণ ডিগ্রি কোর্সের পরিবর্তে বাজারমুখী বিশেষ এবং কর্মসংস্থান-কেন্দ্রিক পেশাদার কোর্সের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে বিএ, বিএসসি ও বিকমের মতো বিপুল জনবহুল কোর্সগুলিতে যুগোপযোগী পরিবর্তন এনে বিএ হসপিটালিটি, বিকম অ্যানালিটিক্স এবং বিএসসি অ্যাপ্লায়েড টেকনোলজির মতো বিশেষায়িত পাঠ্যক্রম চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কর্ম-সমন্বিত এবং শিক্ষানবিশ-ভিত্তিক ডিগ্রি কর্মসূচির (AEDP) ব্যাপক সম্প্রসারণের ডাক দিয়েছে নীতি আয়োগ। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আরও নমনীয় ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি—যেমন মডুলার, খণ্ডকালীন, হাইব্রিড এবং জনপ্রিয় ‘উপার্জন ও শিক্ষা’ (earn-while-you-learn) মডেল চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিগুলি বাস্তবায়িত হলে পড়ুয়ারা ক্লাসরুমের শিক্ষার পাশাপাশি আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। নীতি আয়োগের মতে, এই রূপান্তর সফল করতে হলে সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে শিল্প জগতের সক্রিয় ও সুসংহত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যা দেশের তরুণ প্রজন্মকে একুশ শতকের প্রতিযোগিতাপূর্ণ শ্রমবাজারের উপযোগী করে তুলতে পারে।