ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্যের খেসারত! ভারতের ৪ কোম্পানি ও ৩ নাগরিকের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প প্রশাসনের!

ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখলে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে—পূর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া সেই হুঁশিয়ারিই এবার বাস্তবে রূপ নিল। তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ভারতের চারটি সংস্থা এবং তিনজন ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হোয়াইট হাউস। প্রায় ১১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবৈধ বাণিজ্যিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মার্কিন অর্থ দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ইরানের অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল করতেই এই ধারাবাহিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, ভারতে রেজিস্টার্ড ‘সদাশিবা ওভারসিজ লিমিটেড’ নামক সংস্থাটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রায় ৬৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইরানি উৎসের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি করেছিল। এই বাণিজ্যের বেশ কিছু চালান এমন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল, যাকে ইতিমধ্যেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ‘পিপি সফটটেক প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং ‘প্রকৃতিস ইনফ্রা ইমপেক্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধেও প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার করে ইরানি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির অভিযোগ আনা হয়েছে। এই তিন সংস্থার মোট আমদানির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তালিকায় থাকা চতুর্থ সংস্থাটি হলো ‘পোর্টইজ পার্টনার্স এলএলপি’, যা মূলত একটি শুল্ক-সংক্রান্ত পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে এই সংস্থাটি বিভিন্ন ইরানি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ভারতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অবৈধভাবে সহায়তা করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া কেবল সংস্থগুলির ওপরেই নামেনি, বরং এর সঙ্গে যুক্ত তিনজন ভারতীয় নাগরিকও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে এসেছেন। এদের মধ্যে পিপি সফটটেকের পরিচালক প্রশান্ত গর্গ ছাড়াও পোর্টইজ পার্টনার্সের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ইন্দ্রিসমিয়া আশারাফমিয়া শেখ এবং হরিশ রামচন্দ্র রাঙ্গির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির নীতির অংশ হিসেবেই ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ করে চলেছে। এর আগে মার্কিন অর্থ দফতর ইরানের তেল, পেট্রোকেমিক্যাল এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত একাধিক সংস্থা, সমুদ্রগামী জাহাজ ও প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল। ওয়াশিংটন বরাবরই সতর্ক করে এসেছে যে কোনো বিদেশি সংস্থা যদি ইরানের সঙ্গে একরোখা বাণিজ্য চালিয়ে যায়, তবে তাদেরও আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে আমেরিকার এই একপেশে ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা মোটেও মেনে নেয়নি তেহরান। ইরানের বিদেশ মন্ত্রক এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের পরিপন্থী এবং একটি বড় ধরনের হুমকি বলে অভিহিত করেছে। ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ আত্মবিশ্বাসের সুরেই জানিয়েছেন যে ওয়াশিংটনের এই নতুন চাপ সামলাতে তাদের দেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং এর মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই একটি দীর্ঘমেয়াদী দুই বছরের পরিকল্পনা তৈরি রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন হুঁশিয়ারিকে পাত্তাই দিতে নারাজ। তাঁর স্পষ্ট দাবি, ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদাররা ওয়াশিংটনের এই চাপকে সম্পূর্ণ অর্থহীন বলেই গণ্য করছে এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে অন্য দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করা অসম্ভব।
এদিকে, আমেরিকার এই অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সামরিক সংঘাতের বদলে মার্কিন প্রশাসন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ওপর বেশি জোর দেওয়ায় বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখী লাফে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে ইরান ও ওমানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে একটি অস্থায়ী নৌপথ তৈরির প্রস্তাব নিয়েও কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি এর জবাবে কোনো কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ফের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।