২২ কোটির নয়ছয়! রাজস্থানের বিখ্যাত বুটাটি মন্দিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এফআইআর, তোলপাড় ভক্ত মহলে

রাজস্থানের নাগৌর জেলার বুটাটিতে অবস্থিত ঐতিহাসিক শ্রী চতুর্দসজি মহারাজ মন্দিরটি বহু বছর ধরে লাখ লাখ ভক্তের প্রধান উপাসনা ও বিশ্বাসের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি এই পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে এক বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মন্দিরের ব্যবস্থাপনা, অনুদান, বিপুল পরিমাণ আয় এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নথিপত্রে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আদালতের কঠোর নির্দেশে পুলিশ এই বিষয়ে একটি এফআইআর দায়ের করেছে, যার ফলে দেশজুড়ে এবং স্থানীয় ভক্ত মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রায় ২২.৭৪ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক কার্যকলাপ এবং তার সম্ভাব্য নয়ছয় নিয়ে শুরু হয়েছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত।
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে অভিযোগকারী জয়পাল সিং রাঠোর, সুনীল চৌপাল, দেবকী গ্রাম বুটাটি এবং বলরাম ভগবানের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে খুচেরা থানা গত ২৪ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে এই এফআইআর নথিভুক্ত করে। অভিযোগকারীদের পক্ষে আইনজীবী ডঃ পবন শ্রীমালি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, মন্দিরের দানবাক্সের টাকা, নিয়মিত আয়, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তি এবং প্রশাসনিক নথিপত্রে চরম অনিয়ম করা হয়েছে। প্রথমে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে বারবার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও কোনো সুফল মেলেনি। বাধ্য হয়েই অভিযোগকারীরা আদালতের দ্বারস্থ হন এবং বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপে অবশেষে পুলিশি পদক্ষেপ নিশ্চিত হয়।
আদালতের নির্দেশে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও সংশ্লিষ্ট আইনের বিভিন্ন ধারার অধীনে খুচেরা থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে। এই সংবেদনশীল ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ ধরম পুনিয়াকে। প্রাথমিক অভিযোগে মন্দিরের অনুদান ও আয়ের হিসাবে বড় ধরনের গরমিলের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার নগদ দানের কোনো সঠিক হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এমনকি, সরকারি অনুমোদিত রসিদ বইয়ের বাইরেও প্রায় ২,২১৯টি অতিরিক্ত অবৈধ রসিদ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যা দুর্নীতির জালকে আরও প্রশস্ত করেছে।
তদন্তে মন্দিরের রেজিস্টার এবং প্রকৃত সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর প্রাপ্যতার মধ্যে মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রায় ৩৫,৫০০ কিলোগ্রাম অতিরিক্ত রুপা কেনার কথা বলা হলেও তার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া সোনা ও রুপাসহ অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের আনুমানিক আর্থিক মূল্য যথাক্রমে ২৬ মিলিয়ন রুপি এবং ৭৫,০০০ টাকা বলে দেখানো হয়েছে, যার সঠিক অডিট এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।
মন্দিরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নির্মাণকাজ এবং দৈনিক পরিচালনা খরচ নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে একটি ডাইনিং হল নির্মাণে প্রায় ৪৯.৪৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি, মাত্র দুই বছরে রান্নাঘর পরিচালনা বাবদ প্রায় ১.১৭ কোটি টাকা খরচের অবিশ্বাস্য অঙ্ক পেশ করা হয়েছে। এই বিশাল ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত প্রকৃত বিল, ভাউচার, কেনাকাটার নথি এবং খরচের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এর পাশাপাশি মন্দির চত্বরের দোকানগুলোর ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রেও চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দোকানগুলোর ভাড়ার টাকা মন্দিরের নিয়মতান্ত্রিক তহবিলে জমা না করে প্রায় ১৮.১২ লক্ষ টাকা এবং একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে প্রাপ্ত ১.৪০ লক্ষ টাকা সরাসরি কোনো এক ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৩-২৪ এবং ২০২৫ সালের বিভিন্ন অর্থবর্ষ মিলিয়ে প্রায় ১৫.১৬ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং অনিয়মের তদন্ত দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫-২৬ সালের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থাকায় অতিরিক্ত প্রায় ৭.৫৮ কোটি টাকার সম্ভাব্য নয়ছয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২২.৭৪ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক দুর্নীতির একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। আইনজীবী ডঃ পবন শ্রীমালি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই আইনি লড়াই কোনোভাবেই ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি জনহিতকর ট্রাস্টের সম্পদ এবং সাধারণ ভক্তদের পবিত্র অনুদানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্যই এই পদক্ষেপ। এখন পুলিশি তদন্ত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অডিট এবং রেকর্ড পর্যালোচনার পরেই পুরো ঘটনার আসল সত্যতা প্রকাশ পাবে এবং পরবর্তী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।