বিদেশে কড়া নিয়ম আর ভারতে অবাধে বিষ বিক্রি! চিপস-কোল্ড ড্রিংকের লাল চিহ্ন দেখে কেন আঁতকে উঠছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো?

বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি ভারতে প্যাকেটজাত খাদ্যের ওপর স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ লেবেল লাগানোর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যে সমস্ত নামী বহুজাতিক সংস্থা বিদেশের বাজারে অত্যন্ত কড়া নিয়মকানুন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য হয়, তারাই কীভাবে ভারতে অতিরিক্ত চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর উপাদানে ভরা পণ্য দেদার বিক্রি করে চলেছে?
বিদেশে রেড অ্যালার্ট, ভারতে কী ছবি? পরিসংখ্যান বলছে, লন্ডনে বিক্রি হওয়া এক ক্যান ফ্যান্টার মধ্যে যেখানে মাত্র ৬৩ ক্যালোরি থাকে, ঠিক সেই একই ব্র্যান্ডের ভারতীয় সংস্করণে তিনগুণ বেশি চিনি মেশানো থাকে। ইউরোপের দেশগুলিতে কোনো পানীয়তে কৃত্রিম রং বা ক্ষতিকারক উপাদান থাকলে প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট করে বড় সাইজের স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা ছাপানো বাধ্যতামূলক। অথচ ভারতেই ঠিক একই পণ্যের ক্ষেত্রে সেই সমস্ত তথ্য অত্যন্ত ক্ষুদ্র অক্ষরে প্যাকেটের পেছনে লুকিয়ে রাখা হয়। বিশ্বের প্রথমসারির একাধিক খাদ্য সংস্থা ভারতের এই আইনি শিথিলতার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে।
দ্বৈত নীতি ও লবিংয়ের রাজনীতি একটি সর্বভারতীয় আর্থিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোকা-কোলা এবং নেসলের মতো বৃহৎ সংস্থাগুলি ভারতে প্যাকেটজাত খাবারে লাল রঙের সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবহারের জোরদার বিরোধিতা করছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI)-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে শিল্পপতিরা তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, এই ধরনের লাল রঙের সতর্কবার্তা গ্রাহকদের মধ্যে অযথা বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। এমনকি, যদি এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে ভারতের ৮০ শতাংশেরও বেশি প্যাকেটজাত খাবার সরাসরি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। চাপের মুখে পড়ে এফএসএসএআই শেষ পর্যন্ত প্যাকেটের সামনে লাল বা সবুজ সতর্কতার আইডিয়া থেকে সরে এসে শুধুমাত্র সাদা-কালো সারণি বা চার্ট ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। অথচ এই একই কোম্পানিগুলি ইউরোপের প্রায় ডজনখানেক দেশে সানন্দে ‘ট্র্যাফিক-লাইট’ লেবেল পদ্ধতি মেনে ব্যবসা করছে।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া নজর ও জনরোষ বহুজাতিক সংস্থার এই স্বেচ্ছাচারিতা ও নীতির বিরুদ্ধে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট এফএসএসএআই-এর নমনীয় ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ভারত যে তার দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন, তা সারা বিশ্বের জানা উচিত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ভারতীয় স্থূলতা বা ওবেসিটির শিকার হতে পারেন। তাই প্যাকেজিংয়ের ওপর খাদ্যের সঠিক উপাদান ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য স্পষ্ট থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দেশের সচেতন নাগরিক ও ইনফ্লুয়েন্সাররা (যেমন ‘ফুড ফার্মার’ রেবন্ত হিমাৎসিকা) এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে জোরালো আওয়াজ তুলছেন। ভারতে বিক্রি হওয়া কিটক্যাট বা ম্যাগি নুডলসের সঙ্গে বিদেশের পণ্যের মানের ফারাক নিয়মিত তুলে ধরা হচ্ছে। যেমন, ব্রিটেনে যেখানে ম্যাগি তৈরিতে অপেক্ষাকৃত দামি সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়, সেখানে ভারতেই সস্তা পাম তেল দিয়ে তা তৈরি করা হচ্ছে। সামাজিক ও আইনি চাপের মুখে পড়ে কিছু সংস্থা সামান্য পরিবর্তন আনলেও, এই দ্বৈত নীতির অবসান কবে ঘটবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।