‘নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না যে!’ জন্ম থেকে অসুস্থ যুবকের পায়ে শিকল পরিয়ে প্রকাশ্যে চাবুকের মতো জুতোপেটা!

আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো নয় ২৬ বছরের তরুণ নাসিরুল (নাম পরিবর্তিত)। বয়স আড়াই দশক পেরোলেও তাঁর হাত বাঁধা রয়েছে লোহার শিকলে। সেই ভারী শিকল ধরে টানতে টানতে মানসিক ভারসাম্যহীন ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন দাদা। আর সামান্য প্রতিরোধ করলেই জুতো খুলে বেধড়ক মারধর—এমনই এক নির্মম ও অমানবিক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল মালদা মেডিকেল কলেজ চত্বর। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই গোটা চত্বরে তীব্র চাঞ্চল্য ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরাতন মালদার মহিষবাথানী এলাকার বাসিন্দা ওই যুবকের পরিবারের দাবি, নাসিরুল জন্ম থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন। যখন তাঁর বয়স মাত্র সাত মাস, তখন থেকেই পরিবারের লোকজন এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সুদূর রাঁচি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মাঝেমধ্যে নাসিরুল কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করে বাড়ি থেকে এদিক-ওদিক চলে যান। প্রায় সাত বছর আগে একবার দীর্ঘ ১০ দিন তাঁকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই থেকেই পরিবারের লোকজন তাঁকে চরম আতঙ্কে চোখে চোখে রাখেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবন্ধী শংসাপত্র পাওয়ার জন্য সোমবার চিকিৎসককে দিয়ে পরীক্ষা করাতে নাসিরুলকে মালদা মেডিকেলে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এর আগে গত ১৯ আগস্টও তাঁকে একবার হাসপাতালে আনা হয়েছিল, কিন্তু সেদিন সুযোগ বুঝে নাসিরুল পালিয়ে যাওয়ায় সমস্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো সম্ভব হয়নি। তাই এদিন যাতে কোনোভাবেই তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যেতে না পারেন, তা সুনিশ্চিত করতেই নাসিরুলকে জোর করে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে সাফাই দেওয়া হয়েছে।
এদিন দুপুরে যখন তাঁকে শিকলে বেঁধে টানতে টানতে মালদা মেডিকেলের প্রশাসনিক ভবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন থেকেই নাসিরুলকে আর কোনোভাবেই শান্ত বা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছিল না। তাঁর বারবার করা প্রতিরোধে পরিবারের লোকজন অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। সেই ক্ষোভের বশে দাদা নিজের পায়ে পরা জুতো খুলে মানসিক ভারসাম্যহীন ভাইকে বেধড়ক মারধর করতে শুরু করেন। পাশেই দাঁড়িয়ে দিদিও সমস্ত ঘটনা নীরবে দেখছিলেন। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের এক কর্মীর তৎপরতায় পরিবারটিকে শান্ত করা হয় এবং পরে নাসিরুলকে বুঝিয়ে শান্ত করে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এত কিছুর পরেও এদিন তাঁর প্রতিবন্ধী শংসাপত্র মেলেনি।
ঘটনা প্রসঙ্গে মালদা মেডিকেলের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় জানান, বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালের তরফে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিবারটিকে এই ধরনের অমানবিক আচরণ থেকে নিবৃত্ত করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শংসাপত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে।