মামলা করলেই কি আত্মহত্যায় প্ররোচনা? সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ে বড় স্বস্তি অভিযোগকারীদের!

কারও বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করা, থানায় এফআইআর (FIR) দায়ের করা কিংবা নিজের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি চরম পদক্ষেপ হিসেবে আত্মহত্যা করেন, তবে সেই অভিযোগকারীকে কোনোভাবেই আত্মহত্যায় প্ররোচনার জন্য দায়ী করা যাবে না। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, আইনি পথে নিজের ন্যায়সংগত অধিকার রক্ষার চেষ্টা করা কোনোমতেই ভারতীয় আইনের দৃষ্টিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা প্ররোচিত করার অপরাধের আওতায় পড়ে না।
সাম্প্রতিক অতীতে পারিবারিক অশান্তির জেরে দায়ের হওয়া একটি বিশেষ ফৌজদারি মামলা খতিয়ে দেখতে গিয়ে বিচারপতি মনোজ মিশ্র এবং বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট মামলাটি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে। মামলার মূল সূত্রপাত হয়েছিল একটি পারিবারিক বিরোধ থেকে, যেখানে এক মহিলা তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে গুরুতর গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ এনে এফআইআর দায়ের করেছিলেন। পাশাপাশি স্বামীর কাছ থেকে আইনগতভাবে নিয়মিত ভরণপোষণ চেয়েও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এফআইআর দায়েরের পর ওই মহিলার নিয়মমাফিক চিকিৎসাগত পরীক্ষা বা মেডিকেল টেস্টও সম্পন্ন করা হয়, যেখানে তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল বলে জানা যায়।
পরবর্তী সময়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই মহিলার স্বামী চরম মানসিক অবসাদের জেরে আত্মহত্যা করেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, স্ত্রীর দায়ের করা এফআইআর এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্যই তিনি মারাত্মক মানসিক চাপের মুখে পড়েছিলেন এবং সেই কারণেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে মহিলার বাবা, মা এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৬ ও ১১৪ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করা হয়, যার সমতুল্য বিধান বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৮ ও ৫৪ ধারায় রয়েছে। গুজরাট হাইকোর্ট সেই এফআইআর খারিজ করতে অস্বীকার করায় শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তরা সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন।
সমস্ত আইনি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে যে, কারও বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা বা এফআইআর দায়ের করা—তা পরবর্তী সময়ে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও—তা কখনোই সরাসরি আত্মহত্যায় প্ররোচনা হিসেবে গণ্য হতে পারে না। একইভাবে, আইনি পথে ভরণপোষণ চাওয়া বা নিজের নায্য অধিকার রক্ষায় আদালতের সাহায্য নেওয়াকেও আত্মহত্যায় প্ররোচনা বলা যায় না। বেঞ্চের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য, প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকেরই নিজের অধিকার রক্ষার জন্য উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তির মর্মান্তিক আত্মহত্যার সঙ্গে সেই আইনি পদক্ষেপকে সরাসরি যুক্ত করতে হলে প্ররোচনা বা ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করার মতো সুনির্দিষ্ট ও শক্তপোক্ত আইনি উপাদান থাকা বাধ্যতামূলক। শেষ পর্যন্ত এই মামলায় এমন কোনো জোরালো প্রমাণ না মেলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।