ইমরান খানের শারীরিক অবনতি, চিকিৎসা নিয়ে খোঁজ গাভাসকর-কপিলের

ক্রিকেটের বাইশ গজে ভারত-পাকিস্তান লড়াই মানেই চিরন্তন উত্তেজনা এবং ঠাসা রোমাঞ্চ। মাঠের ভেতরে একে অপরের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চললেও, বাইরের দুনিয়ায় খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক যে সম্পূর্ণ আলাদা, তার আরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বিশ্ব ক্রিকেটের একসময়ের মহারথীরা। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি অধিনায়ক ইমরান খানের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্রিকেট বিশ্বের ২২ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক। বর্তমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে সরাসরি চিঠি দিয়ে ইমরানের সুচিকিৎসা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এই বিশিষ্টদের তালিকায় ভারতের হয়ে স্বাক্ষর করেছেন দুই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেব ও সুনীল গাভাসকর, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত প্রায় তিন বছর ধরে ৭৩ বছর বয়সি ইমরান খান পাকিস্তানের একটি কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ কারাবাসের জেরে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ায় ক্রিকেট বিশ্বে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক তারকারা দাবি তুলেছেন যে, ইমরানের শারীরিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকারের আরও বেশি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং মানবিক হওয়া প্রয়োজন। এর আগে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইম্রানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি সপ্তাহে কারাগারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল আদালতের রায়ে।

তবে সাবেক অধিনায়কদের মূল অভিযোগ, আদালতের সেই সুস্পষ্ট নির্দেশকে পুরোপুরি মান্য করা হচ্ছে না। তাঁদের দাবি, কারাবন্দি ইমরানকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে সরকারি চিকিৎসকরা দায়সারাভাবে তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে ঘোষণা করে ফের আদিয়ালা জেলে পাঠিয়ে দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যথাযথ ও নিরপেক্ষ চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ব ক্রিকেটের এই কিংবদন্তি প্রাক্তনীরা।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সফল অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলের উদ্যোগে মূলত এই যৌথ চিঠিটি প্রস্তুত করা হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আবেদন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে করা হচ্ছে না। বরং দীর্ঘদিনের সতীর্থ, সহকর্মী এবং খেলাধুলার সুবাদে একে অপরকে চেনার সুবাদেই তাঁরা সহানুভূতির জায়গা থেকে ইমরানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

চিঠিতে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পেশ করা হয়েছে। প্রথমত, আদালতের নির্দেশ মেনেই একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করতে হবে, যে বোর্ডে ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসকদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দিতে হবে। তাঁর সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের গুরুতর অভিযোগটি খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের প্যানেল যে চিকিৎসার পরামর্শ দেবেন, তাতে কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সেই মতো চিকিৎসা শুরু করতে হবে। তৃতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে সম্মান জানিয়ে ইমরানের পরিবারের সদস্যরা যাতে প্রতি সপ্তাহে নির্বিঘ্নে তাঁর সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।

বিশ্বের প্রায় ৯টি ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের সাবেক অধিনায়করা এই চিঠিতে সই করেছেন। ভারতের সুনীল গাভাসকর, কপিল দেব এবং দিলীপ বেঙ্কটসরকার ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে একঝাঁক উজ্জ্বল নাম। অস্ট্রেলিয়ার অ্যালান বর্ডার, গ্রেগ চ্যাপেল ও ইয়ান চ্যাপেল, ইংল্যান্ডের নাসির হুসেন ও অ্যালেস্টার কুক এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েডের মতো তারকারা এই ঐতিহাসিক চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। একসময়ে মাঠের লড়াইয়ে যে ক্রিকেটাররা একে অপরের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, আজ খেলার বাইরের সেই বন্ধন ও বন্ধুত্বের টানেই তাঁরা ইমরানের চিকিৎসা ও মানবিক অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।