কমবয়সীদের মধ্যে লাফিয়ে বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক! শুধু কোলেস্টেরল নয়, কোন মারাত্মক ভুল করছেন আপনি?

আজকাল হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগের মতো মারাত্মক সমস্যা আর কেবল বয়স্কদের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আটকে নেই। অনিয়মিত জীবনযাপন, কাজের অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং ফাস্টফুড বা অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসের কারণে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সি তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি অত্যন্ত দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কেমন আছে তা দেখে হৃদযন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিচার করা মারাত্মক ভুল। শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে খাদ্যতালিকা, জীবনযাত্রার মান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সমানভাবে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, কোলেস্টেরল নিঃসন্দেহে হৃদরোগের একটি অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ, তবে এটিই একমাত্র নিয়ামক নয়। এর পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যায়াম না করার প্রবণতাও হার্ট অ্যাটাকের মতো বড় বিপদের পথ প্রশস্ত করে। তাই শুধুমাত্র একটি রক্ত পরীক্ষার ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে সামগ্রিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন বা ওভারঅল হেলথ স্ক্রিনিং করা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজন। হার্টকে সুস্থ ও সচল রাখতে প্রতিদিনের রুটিনে কয়েকটি সহজ কিন্তু কার্যকরী অভ্যাস মেনে চলা উচিত।

প্রথমত, প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে রঙিন খাবার বা পুষ্টিকর উপাদানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। নিয়মিত তাজা শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের ফল, ডাল, বাদাম, গোটা শস্য এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিন খাওয়ার অভ্যাস করুন। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, প্যাকেটজাত প্রসেসড ফুড, সফট ড্রিঙ্ক এবং ট্রান্স ফ্যাট বা ভাজাভুজি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। এগুলি শরীরে প্রদাহ কমায় এবং রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এর জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল কোনো জিমে ভর্তি হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। নিয়মিত দ্রুত গতিতে হাঁটা, সাইকেল চালানো, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা হালকা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ হৃদযন্ত্রকে সক্রিয় রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

তৃতীয়ত, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা টেনশন শরীরে ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে সরাসরি হৃদযন্ত্রের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন বা ধ্যান, গভীর শ্বাসের ব্যায়াম (ডিপ ব্রিদিং) কিংবা পরিবারের সঙ্গে কিছুটা মানসম্মত সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।

চতুর্থত, দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা আবশ্যক। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ঘটলে শরীরের রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং প্রদাহ—এই তিনটিই বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া হৃদস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর বিকল্প নেই। শুধুমাত্র কোলেস্টেরল নয়, সময়মতো রক্তচাপ, ব্লাড সুগার, শরীরের ওজন পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্ডিয়াক টেস্ট করান। অনেক সময় শরীরে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ প্রকাশ না পেলেও নীরব ঘাতকের মতো হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মনে রাখবেন, হঠাৎ করে একদিনে যেমন হার্ট অ্যাটাক হয় না, তেমনি একটি সুস্থ ও সবল হৃদয়ও একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সুঅভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সুরক্ষিত বর্ম হয়ে উঠতে পারে।