‘ছোটবেলা থেকেই শিব আমার আরাধ্য’! ইটের ভাটায় গড়ে ওঠা প্রেম, তারপর বরেলির আশ্রমে ধুমধাম করে বিয়ে

চার বছরের দীর্ঘ টানাপোড়েন এবং সমস্ত সামাজিক বাধার প্রাচীর ভেঙে অবশেষে ভালোবাসার এক অদ্ভুত পরিণতির সাক্ষী থাকল উত্তরপ্রদেশের বরেলি। রাজস্থানের জয়পুরের একটি সাধারণ ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ করার সুবাদে তৈরি হওয়া পরিচয় কীভাবে কালক্রমে গভীর প্রেমে এবং পরবর্তীতে এক অটুট বৈবাহিক সম্পর্কে পরিণত হতে পারে, তারই এক বাস্তব উদাহরণ তৈরি করলেন রাজিয়া ও তোতরাম। পেশাগত জীবনে জয়পুরের ওই ইটভাটার ধুলোবালি আর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের মাঝে দুজনের আলাপ হয়েছিল। কাজের ফাঁকে ছোটখাটো কথার লেনদেন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান—এভাবেই ধীরে ধীরে একে অপরের কাছাকাছি আসেন তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পেশাগত সখ্যতা গভীর প্রেমে রূপ নেয় এবং দুজনেই জীবনের বাকি পথ একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্মের দেওয়াল। ভিন্ন ধর্মের মানুষ হওয়ায় তাদের এই সম্পর্কের তীব্র বিরোধিতা করে দুই পরিবারের সদস্যরাই।
সমস্ত প্রতিকূলতা ও পারিবারিক হুমকিকে উপেক্ষা করে রাজিয়া নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো ধরনের জোরাজুরি বা বাহ্যিক চাপের মুখে নেওয়া হয়নি। নিজের ইচ্ছাতেই তিনি সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে সনাতন ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নতুন নাম বেছে নেন গৌরী দেবী। সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে গৌরী দেবী জানান যে, ছোটবেলা থেকেই তাঁর হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি এবং বিশেষ করে দেবাদিদেব মহাদেবের প্রতি এক অগাধ বিশ্বাস ও টান ছিল। তিনি বহুদিন ধরেই মনে মনে সনাতন ধর্মে দীক্ষিত হয়ে শিব আরাধনা করার কথা ভেবেছিলেন। অবশেষে বরেলির প্রখ্যাত অগস্ত্য মুনি আশ্রমে এসে তিনি নিজের সেই দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেন।
এই সম্পর্কের আইনি ও ধর্মীয় স্বীকৃতি পেতে এই যুগল সোজাসুজি হাজির হন বরেলির অগস্ত্য মুনি আশ্রমে। সেখানে প্রধান পুরোহিত আচার্য কে কে শঙ্খধরের কাছে তারা তাদের সম্পূর্ণ প্রেমের কাহিনী এবং বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। কোনো রকম রাখঢাক না করে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্তবয়স্কতার অকাট্য প্রমাণপত্রগুলি পুরোহিতের হাতে তুলে দেন। আচার্য কে কে শঙ্খধর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সমস্ত সরকারি নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেন এবং উভয়ের প্রাপ্তবয়স্কতা নিশ্চিত হওয়ার পরই ধর্মান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এরপর সমস্ত বৈদিক নিয়ম মেনে, মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে তাঁরা একে অপরকে মালা পরায় এবং পবিত্র অগ্নির চারপাশে সাতটি বচন গ্রহণ করে চিরকালের মতো স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হন।
তবে এই আনন্দের মাঝেও নবদম্পতির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে পারিবারিক নিরাপত্তা। বিয়ের পরেই গৌরী দেবী অর্থাৎ রাজিয়া প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর পরিবারের কিছু ক্ষুব্ধ সদস্যের কাছ থেকে তাঁর এবং তাঁর স্বামী তোতরামের জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করে তাঁরা স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশের কাছে কঠোর নিরাপত্তার আর্জি জানিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে অগস্ত্য মুনি আশ্রমের প্রধান পুরোহিত আচার্য কে কে শঙ্খধর সংবাদমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, আইনি দিক থেকে দুজনেই সাবালক এবং তাঁরা সম্পূর্ণ নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় এই বিয়ে করেছেন। যেহেতু তাঁদের আত্মীয়দের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাই এই স্পর্শকাতর বিষয়টি মাথায় রেখে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নবদম্পতির জন্য পর্যাপ্ত ও সুদৃঢ় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।