সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে একেবারে ভিনদেশ থেকে সোজা ভারতে! উজ্জয়িনীতে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে চার হাত এক হল তিন বিদেশি জুটির

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শহর উজ্জয়িনীর বুকে সম্পন্ন হলো এক অনন্য ও জমকালো বিবাহ উৎসব। এই বিয়েতে কোনো ভারতীয় দম্পতি নয়, বরং সুদূর বিদেশ থেকে আসা তিনটি ভিন্ন বিদেশি দম্পতি বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাতপাক ঘুরে পবিত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। সম্পূর্ণ ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্য ও কৃষ্টি মেনে এই বিয়ের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। জাঁকজমকপূর্ণ এই বিবাহ অনুষ্ঠানে বর ও কনের গায়ে হলুদ এবং মেহেন্দি পর্ব থেকে শুরু করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা—সবকিছুই ছিল দেখার মতো।
যোগগুরু ডঃ ওমানন্দ মহারাজের পৃষ্ঠপোষকতায় ইন্দোর রোডের নিনোরা আনন্দের ওয়েলনেস রিট্রিট পার্কে এই ব্যতিক্রমী বিবাহ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। ডঃ ওমানন্দ জানান যে, তাঁর যোগশিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর বহু বিদেশি শিষ্য রয়েছেন। তিনি নিয়মিতভাবেই তাঁর এই শিষ্যদের ভারতীয় সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বৈদিক বিবাহের অটুট ও পবিত্র বন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তাঁর এই আধ্যাত্মিক শিক্ষায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতালি, স্পেন এবং ইংল্যান্ডের তিনটি বিদেশি দম্পতি সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে ভারতীয় রীতিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
বৈদিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন এই বিয়ের পূর্বে তিনটি দম্পতিরই নতুন নামকরণ করা হয় এবং তাঁদের সুন্দর ও অর্থপূর্ণ ভারতীয় সনাতন নাম দেওয়া হয়। প্রথম দম্পতির ক্ষেত্রে ইতালির ইভ ও মাসিমিলিয়ানোর নাম রাখা হয় যথাক্রমে ‘দর্পণ আনন্দ’ এবং ‘বলরাম আনন্দ’। দ্বিতীয় দম্পতি হিসেবে ইতালির জেসিকা ও লুকার নতুন নাম দেওয়া হয় ‘মা সীতা আনন্দ’ এবং ‘রাম আনন্দ’। এছাড়া তৃতীয় দম্পতি হিসেবে স্পেনের ইনমার নাম রাখা হয় ‘মা শান্তি আনন্দ’ এবং ইংল্যান্ডের মার্কের নাম রাখা হয় ‘প্রকাশানন্দ’। এর আগেও ২০২৪ সালে ইতালি, আমেরিকা ও পেরু থেকে আসা তিনটি দম্পতি ডঃ ওমানন্দ মহারাজের আশ্রমে সনাতন রীতি মেনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
ডঃ ওমানন্দ গুরু এই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করে জানান যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে সাধারণত বিবাহকে কেবল একটি আইনি চুক্তি বা লিগ্যাল কন্ট্রাক্ট হিসেবে দেখা হয়, যা মানুষ যেকোনো সময় খুব সহজেই ভেঙে ফেলতে পারে। এর ঠিক বিপরীতে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিবাহকে কেবল দুটি দেহের নয়, বরং দুটি আত্মার মিলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আজীবন সযত্নে বজায় রাখতে হয়। ভারতীয় সংস্কৃতির এই অনন্য দর্শন এবং গভীরতা বিদেশিদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করেছে।
বিয়ের মূল অনুষ্ঠানে বর-কনে সহ বরযাত্রার সমস্ত বিদেশি অতিথিরা ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাকে সেজেছিলেন। গায়ে হলুদ এবং মেহেন্দি অনুষ্ঠানে সমস্ত বিদেশি অতিথিরা ভারতীয় লোকগীতি, স্তোত্র ও সিনেমার গানের সুরে আনন্দে মেতে ওঠেন এবং নেচে ওঠেন। পশ্চিমা দুনিয়ার অন্ধ অনুকরণ যখন সমাজের একটি বড় অংশকে গ্রাস করছে, ঠিক সেই সময়ে বিদেশি নাগরিকদের এমনভাবে ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশ করা সত্যি এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।