‘আপনাদের পাপের ফল ভোগ করছি!’ হাওড়ার বেহাল দশা নিয়ে প্রাক্তন সরকারকে তুলোধোনা মন্ত্রীর

রাজ্য বিধানসভায় দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর অবশেষে ধ্বনিভোটে পাশ হয়ে গেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাওড়া পুরনিগম সংশোধনী বিল। এই নতুন বিলের জেরে হাওড়া পুরনিগমের বর্তমান ওয়ার্ড সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৬৮টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে প্রশাসনিক পরিষেবা আরও উন্নত করার লক্ষ্যেই এই সীমানা পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় এই বিলের জবাবি ভাষণে দাঁড়িয়ে হাওড়ার বর্তমান বেহাল পুর-পরিষেবা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার জন্য পূর্বতন সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন এবং তাদেরই কাঠগড়ায় তোলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
বিগত সরকারের সমালোচনায় মুখ খুলে মন্ত্রী দাবি করেন, পূর্বতন বোর্ডের চরম অপদার্থতার মাশুল আজ বর্তমান সরকারকে কড়ায়-গণ্ডায় গুনতে হচ্ছে। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি অতীতে বালি ও হাওড়া পুরসভার সংযুক্তি এবং পরবর্তীতে তা আবার বিচ্ছেদের প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। প্রশাসনের অন্দরে তৈরি হওয়া এই চরম প্রশাসনিক জটিলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনাদের এই অস্থিরচিত্ত ও অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের ফলে আজ কর্মচারীদের নিয়মিত মাইনে, পেনশন প্রদান থেকে শুরু করে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট—সর্বত্র এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এসবের খেসারত আজ দফতর এবং আমাকে একযোগে ভোগ করতে হচ্ছে।”
এদিন শহরের বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা এবং জলমগ্নতার চিত্র নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন পুরমন্ত্রী। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তাঘাট জলমগ্ন হয়ে পড়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলাকেই প্রধানত দায়ী করেছেন। বিরোধীদের একহাত নিয়ে তিনি বলেন, “আজ হাওড়ার সবথেকে বড় সমস্যা জল জমে থাকা। সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় হাঁটু সমান জল দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।” নর্দমা অবরুদ্ধ হওয়ার আসল কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, “সমস্ত ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ শুধু প্লাস্টিক বেরিয়ে আসছে, যা আপনারাও অতীতে দেখতে পারতেন।” পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ কঠোর হাতে রুখতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যজুড়ে কড়া জরিমানা চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণাও করেন তিনি।
শহরে ঘটে চলা লাগামছাড়া বেআইনি নির্মাণ নিয়ে পূর্বতন বোর্ডকে তীব্র আক্রমণ করেন অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর সরাসরি অভিযোগ, শহরে বিগত দিনে কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই একের পর এক অবৈধ বহুতল গড়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “হাওড়াতে এত গুচ্ছ গুচ্ছ বেআইনি ভবন কীভাবে তৈরি হলো? আপনারা তখন চোখে দেখেননি কেন? কারণ আপনাদের কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো দামই ছিল না।” জনঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই যে বর্তমান ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আজকে জনসংখ্যা এত বাড়লে ওয়ার্ড সংখ্যা কি বাড়ানো উচিত নয়? সাধারণ মানুষকে নাগরিক পরিষেবা প্রদান করা কি আমাদের সরকারের মৌলিক দায়িত্ব নয়?”
বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে পুরভোট না করানোর ফলে হাওড়া পুরসভা যে কেন্দ্র সরকারের পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের বিপুল পরিমাণ অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাও এদিন স্পষ্ট ভাষায় জানান মন্ত্রী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সময়মতো নির্বাচন না করার এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে পঞ্চদশ অর্থ কমিশন থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অনুদান হারিয়েছে হাওড়া।” এদিকে হাওড়ায় পুরভোট কবে অনুষ্ঠিত হবে, বিরোধীদের এই বহুচর্চিত প্রশ্নের কড়া জবাব দিয়ে মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, “নির্বাচন কবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক দলের পার্টি অফিসে বসে ঠিক করা হবে না, যেমনিটা অতীতে আগের সরকার করত। রাজ্য নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকার যৌথভাবে আলোচনা করেই হাওড়া কর্পোরেশনের ভোটের দিন চূড়ান্ত করবে।”
তবে কেবল পূর্বতন সরকারের সমালোচনা বা ব্যর্থতা তুলে ধরাই নয়, এর পাশাপাশি হাওড়ার সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও নতুন পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন পুরমন্ত্রী। শহরের গরিব বস্তিবাসীদের জন্য পিপিপি (PPP) মডেলে অত্যাধুনিক বহুতল আবাসন তৈরি করা হবে এবং লটারির মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের হাতে ফ্ল্যাট তুলে দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শহরের দীর্ঘদিনের নিকাশি, ভাঙা রাস্তাঘাট এবং তীব্র পানীয় জলের সংকট স্থায়ীভাবে মেটাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান আনা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। পানীয় জলের তীব্র সমস্যা চিরতরে দূর করতে সাঁকরাইলে ৪৬২ কোটি টাকা বিশাল ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ চলছে। এই বিষয়ে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ইনটেক জেটির কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে এবং আগামী মার্চের মধ্যে শহরবাসীর ঘরে ঘরে জল ডিস্ট্রিবিউশন শুরু হয়ে যাবে।” সবমিলিয়ে, হাওড়া শহরের দীর্ঘদিনের জৌলুস ফিরিয়ে এনে আধুনিক সৌন্দর্যায়ন এবং উন্নততম নাগরিক পরিষেবা সুনিশ্চিত করাই যে বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য, তা এদিন বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ফের অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিলেন পুরমন্ত্রী।