রেপো রেট না কমার শঙ্কা! কোন কোন কারণে এখনই স্বস্তি মিলছে না ঋণগ্রহীতাদের?

আগামী ৩ থেকে ৫ অগাস্ট বৈঠকে বসতে চলেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই-এর (RBI) মুদ্রানীতি কমিটি (MPC)। এই ত্রৈমাসিক বৈঠকে সুদের হার বা রেপো রেট (Repo Rate) অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে জোরালো পূর্বাভাস দিয়েছে এসবিআই রিসার্চ (SBI Research)। এর সহজ অর্থ হলো, চলতি অগাস্ট মাসে সাধারণ মানুষের হোম লোন, কার লোন বা অন্যান্য ঋণের ইএমআই (EMI) কমার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং কিস্তির পরিমাণ আগের মতোই একই জায়গায় বজায় থাকতে পারে।
অর্থনীতির বৃদ্ধি বনাম মূল্যবৃদ্ধির চাপ
এসবিআই রিসার্চের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার (GDP Growth) ৭ শতাংশের বেশি হতে পারে। ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হলেও, এখনই সুদের হারে কোনো বড় বদল আনতে চাইবে না কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। এর পিছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মূল্যবৃদ্ধির লাগামহীন পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং টাকার ওপর ক্রমাগত চাপ।
রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, আগামী দুটি ত্রৈমাসিকেও খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের উপরেই থাকতে পারে। এমনকি পুরো ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষজুড়ে গড় মূল্যবৃদ্ধির হার প্রায় ৫ শতাংশের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) ও পণ্যের চড়া দাম, বৈদেশিক বিনিয়োগের ওঠানামা এবং মার্কিন ডলারের তুলনায় টাকার মানের ওপর চাপ থাকায় আরবিআই আপাতত সুদের হার কমানোর ঝুঁকি নেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
ফোরেক্স রিজার্ভ ও বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বা ফোরেক্স রিজার্ভের (Forex Reserve) পরিস্থিতি অবশ্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক। এসবিআই রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত ভারতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি মূলধন প্রবেশ করেছে। এর ফলে গত ২৪ জুলাই পর্যন্ত আরবিআই তাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি, স্বল্পমেয়াদি ফরওয়ার্ড ডলারের অবস্থানও প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার কমানো হয়েছে, যা ভারতীয় মুদ্রার ওপর থেকে কিছুটা চাপ কমাতে সাহায্য করেছে। এসবিআই-এর মতে, দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় ভারতীয় টাকা যতটা দুর্বল হয়েছে, বাস্তবে তা হওয়ার কথা ছিল না। বাজার সামাল দিতে আরবিআই ইতিমধ্যেই ডলার কেনাবেচার কৌশলে কিছু পরিবর্তন এনেছে।
ভালো বর্ষা এবং আন্তর্জাতিক ঝুঁকি
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্বস্তির খবর হলো, জুলাই মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টির জেরে দেশজুড়ে ঘাটতি অনেকটাই কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের জলাধারগুলিতে পর্যাপ্ত জল রয়েছে এবং খরিফ মরসুমের চাষও সন্তোষজনক স্তরে রয়েছে।
তবে মুদ্রানীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ঝুঁকিগুলিকে উড়িয়ে দিচ্ছে না আরবিআই। পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, মার্কিন অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়া, মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সংক্রান্ত টানাপোড়েন বিশ্ব বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সব দিক বিবেচনা করে এসবিআই রিসার্চের স্পষ্ট মত, দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি মজবুত হলেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ, মুদ্রার অবস্থান এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে আসন্ন বৈঠকে রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখার পথেই হাঁটতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।