বিধানসভায় বেনজির ছবি: কুণাল-মদন-শোভনদেবদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর! কী বার্তা মিলল?

বৃহস্পতিবার বিধানসভায় এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। একদিকে যখন রাজ্যপালের ভাষণের মধ্য দিয়ে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে, অন্যদিকে তখন বিধানসভার অন্দরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পাঁচ বিধায়ক। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বৈঠকে উপস্থিত এই বিধায়করা সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী বা ‘মমতাপন্থী’ হিসেবে পরিচিত। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কুণাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অশোক দেব এবং রহিম বক্সি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে এই বৈঠক রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বৈঠকের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল কয়েকদিন আগেই, যখন বেলেঘাটার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দারের গ্রেফতারি নিয়ে সরব হন কুণাল ঘোষ। তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পুলিশি হেনস্থা থামানোর আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই ১৮ জুন রাজ্যপালের ভাষণের পর এই মুখোমুখি আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্রের খবর, এদিনের বৈঠকে মূলত তিনটি প্রধান ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথমত, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মমতার পিএসও হিসেবে কর্মরত স্বরূপ গোস্বামী ও কুসুম কুমার দ্বিবেদীকে সম্প্রতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডেরেক ও’ব্রায়েনসহ কালীঘাট শিবিরের আপত্তির মুখে এই বদলি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। যদিও নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে যে, জেড প্লাস নিরাপত্তার কোনো হেরফের হয়নি, তবুও কুণাল ঘোষের অনুরোধ ছিল মুখ্যমন্ত্রী যেন সৌজন্যের খাতিরে পুরনো টিমের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন বলেই জানা গেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজ্যজুড়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও মিথ্যে মামলার অভিযোগ নিয়ে কুণালরা মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কুণালের সাফ বক্তব্য, অপরাধের বিচার হোক, কিন্তু রাজনৈতিক হেনস্থা কাম্য নয়। তৃতীয়ত, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন বিধায়করা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে হকারদের ওপর বুলডোজার চালানো বন্ধ করা হোক এবং তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবস্থা করা হোক।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যারা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা রেখেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। দলের অন্দরের অস্থিরতা কমানোর জন্য এবং মানুষের স্বার্থে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বৈঠকে উপস্থিত বিধায়করা তৃণমূলের অনুগত, কিন্তু নির্দিষ্ট ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের এই সরাসরি সংলাপ রাজ্য সরকারের সঙ্গে শাসকদলের কিছুটা হলেও দূরত্ব কমানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন অনেকে। বাজেট অধিবেশনের প্রাক্কালে এই বৈঠক বিধানসভার অন্দরে রাজনৈতিক সমীকরণের এক নতুন মাত্রা যোগ করল।