নড়বড়ে হিজবুল্লাহ, ফের পাদপ্রদীপের আলোয় ‘আমাল’? লেবাননের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত!

লেবাননের বর্তমান টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সেদেশের প্রবীণ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন ‘আমাল আন্দোলন’। পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনটি আজ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষমতার মূল ভিত্তি। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, হিজবুল্লাহর চ্যালেঞ্জ এবং নাবিহ বেরির নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে ‘আমাল’ আজ লেবাননের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য সমীকরণ।
‘আমাল’ শব্দের অর্থ ‘আশা’। ১৯৭০-এর দশকে ইমাম মুসা সদর শিয়া সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এই আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। প্রান্তিক শিয়াদের সংগঠিত করে রাজনৈতিক মূল স্রোতে নিয়ে আসাই ছিল এর লক্ষ্য। ১৯৭৮ সালে মুসা সদরের রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর আন্দোলনের হাল ধরেন বর্তমান স্পিকার নাবিহ বেরি। তাঁর সুদীর্ঘ ও চতুর নেতৃত্বের হাত ধরে আমাল আন্দোলন লেবাননের শাসনব্যবস্থার এক অপরিহার্য স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে আমাল আন্দোলন তিনটি স্তরে কাজ করছে—প্রথমত, শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে; দ্বিতীয়ত, লেবাননের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর অংশীদার হিসেবে; এবং তৃতীয়ত, আঞ্চলিক অস্থিরতার মাঝে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে। হিজবুল্লাহ এবং আমাল—উভয়ই শিয়া রাজনীতিতে প্রভাবশালী হলেও, তাদের কার্যপদ্ধতিতে বিস্তর ফারাক রয়েছে। হিজবুল্লাহ যেখানে সামরিক শক্তি প্রদর্শনে বেশি বিশ্বাসী, আমাল সেখানে সংসদীয় গণতন্ত্র, সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতিতে বেশি দক্ষ।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও ইসরায়েল-লেবানন উত্তেজনার মুখে হিজবুল্লাহর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমবর্ধমান। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ কিছুটা ব্যাকফুটে গেলে আমাল আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব আরও বাড়বে। নাবিহ বেরিকে এখন কেবল দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে আলোচনার মাধ্যম ও সংকট নিরসনকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সংগঠনের অন্দরে এখন চিন্তার প্রধান কারণ হলো ‘উত্তরাধিকার’। নাবিহ বেরির বয়স ও স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনার জেরে প্রশ্ন উঠেছে—তাঁর পরে আমালের হাল ধরবেন কে? বেরির ব্যক্তিত্বই এতকাল সংগঠনটিকে অটুট রেখেছিল। তাঁর অবর্তমানে আমালের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে এখন থেকেই শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। লেবাননের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক জোট ও আঞ্চলিক চাপের প্রভাবে আমাল আন্দোলন যেভাবে টিকে আছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। দীর্ঘস্থায়ী এই সংগঠনটি আগামী দিনে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝে লেবাননের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কী ভূমিকা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।