পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুরের পালপাড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৫৫০ বছরের প্রাচীন কিশোর জীউর নবরত্ন মন্দির। ৪০ ফুটেরও বেশি উচ্চতা এবং নয় চূড়া বিশিষ্ট এই তিনতলা মন্দির একসময় এলাকার জমিদার রায় মহাপাত্র পরিবারের গৌরব ছিল। যদিও বর্তমানে মন্দিরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে—ইট-পাথর খসে পড়ছে এবং অধিকাংশ চূড়াই ধ্বংসপ্রাপ্ত, তবুও এটি পূর্ব মেদিনীপুরের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম।
বহু পর্যটকের কাছে এখনও অজানা থাকা এই মন্দিরটি স্থানীয়দের কাছে একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
মন্দিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
মেদিনীপুরের ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি গবেষক অরিন্দম ভৌমিক তাঁর ‘মেদিনী কথা’ গ্রন্থে এই মন্দিরটির উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মন্দিরটি আনুমানিক সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন এলাকার জমিদার রায় মহাপাত্র। প্রতাপভান বা নাইগাঁ দণ্ডপাটের শেষ রাজা অমর সিংয়ের মৃত্যুর পর রাজ্যের নয় আনা অংশের অধিকার পান এই রায় মহাপাত্র পরিবার। এরপর জমিদারি পত্তন করেই তাঁরা কিশোর জীউর উপাসনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই মন্দির এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
গঠন শৈলী ও অলংকরণ:
আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক মন্মথ দাস তাঁর ‘পটাশপুরের সেকাল-একাল’ গ্রন্থে মন্দিরটির গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এটি ২০ ফুট বর্গাকার এবং ৪০ ফুটেরও বেশি উঁচু। নয় চূড়া বিশিষ্ট এই মন্দিরের তিনতলায় একসময় ওঠা যেত। বর্তমানে কেন্দ্রীয় চূড়া ছাড়া বাকি সব চূড়াই বিনষ্ট।
মন্দিরের অলংকরণ প্রায় মুছে গেলেও, প্রবেশপথের দেওয়ালে কূর্ম, মৎস্য, বরাহ ও নৃসিংহ অবতারের টেরাকোটা ফলক এখনও চোখে পড়ে। এর ত্রিখিলান দালানের ছাদ অর্ধগোলাকৃতি খিলানের উপর এবং গর্ভগৃহের ছাদ গম্বুজ দ্বারা নির্মিত।
দিঘা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দিরটি প্রাচীন স্থাপত্যে আগ্রহী পর্যটকদের জন্য একটি আদর্শ স্থান। বাজকুল থেকে এগরা–বাজকুল রাজ্য সড়ক ধরে প্রায় ২৩ কিলোমিটার পথ পেরোলেই সহজেই পালপাড়ায় পৌঁছানো যায়। দিঘা ভ্রমণ শেষে স্বল্প সময়ে ঐতিহাসিক এই স্থানটি ঘুরে আসার সুযোগ রয়েছে।