রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক ফ্রন্টের বাইরেও এই সংঘাত এখন অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও কৌশলগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দু’দিনের ভারত সফর রাশিয়ার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরে আসার জন্য রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ছিল।
ব্যাঙ্কিং চ্যালেঞ্জে ভারতের ভূমিকা:
পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে কার্যত বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। রাশিয়ায় বিদেশি ব্যাংক কার্ড ব্লক করা হয়েছে এবং রাশিয়ান কার্ডগুলি বিদেশে বৈধ নয়। এই অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে রাশিয়া জাতীয় মুদ্রায় লেনদেনকে উৎসাহিত করছে।
এই কারণেই পুতিনের সঙ্গে এবার বেশ কয়েকটি রাশিয়ান ব্যাংকের প্রধান ভারতে এসেছিলেন। উভয় দেশই ২০৩০ সালের মধ্যে আর্থিক লেনদেন সহজীকরণ, বিকল্প অর্থপ্রদান ব্যবস্থায় কাজ করা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। ভারতের মতো একটি স্থিতিশীল, বৃহৎ এবং নির্ভরযোগ্য বাজার রাশিয়ার অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুতিনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল:
ইউক্রেন যুদ্ধের পর G20-এর মতো শীর্ষ সম্মেলনগুলি থেকে পুতিনকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিল পশ্চিমারা। তবে তাঁর ভারত সফর সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা, একান্ত নৈশভোজ এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে জমকালো সংবর্ধনা প্রমাণ করেছে যে পুতিন বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক অর্থনীতির কাছে এখনও একজন বিশেষ অংশীদার।
ভারতে এসে পুতিন পশ্চিমা বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিলেন—রাশিয়াকে বিশ্ব রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের জন্য রাশিয়া অপরিহার্য, এই সূক্ষ্ম বার্তাটি ভারতও প্রতিষ্ঠা করেছে।
গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ: শান্তির বার্তা:
মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাষ্ট্রপতি পুতিনের রাজঘাট সফর ছিল একটি গভীর কূটনৈতিক পদক্ষেপ। যখন ইউক্রেনীয় সংঘাতের মধ্যে পুতিন বিশ্বের কাছে শান্তির আবেদন জানালেন, আর তা এলো গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ থেকে, তখন আন্তর্জাতিকভাবে এর ভিন্ন প্রভাব পড়ল। এই পদক্ষেপ রাশিয়ার কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উন্নত করে এই বার্তা দিয়েছে যে রাশিয়া কেবল যুদ্ধের মুখ নয়, বরং সংলাপ ও ভারসাম্যের কণ্ঠস্বরও।
ভারত-রাশিয়া অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: ভবিষ্যতের জন্য অংশীদারিত্ব
ভারত ও রাশিয়া ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করেছে। এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, প্রতিরক্ষা এবং সমুদ্র করিডোরে সহযোগিতা বৃদ্ধির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। ইউরোপ যখন সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন রাশিয়া ভারতের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে একটি কৌশলগত-অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। এই পদক্ষেপ পশ্চিমা চাপ মোকাবেলায় রাশিয়ার ক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে।
মাত্র দুই দিনের এই সফর বিশ্ব রাজনীতিতে তিনটি বড় সংকেত পাঠিয়েছে: ১. রাশিয়া বিচ্ছিন্ন নয়; ২. অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী, যা একটি প্রতিরক্ষামূলক ঢাল দেবে; ৩. রাশিয়া তার কূটনৈতিক ভাবমূর্তিতে শান্তি ও ভারসাম্যের বার্তা যুক্ত করেছে।