টিনের চালার ঘর যেন চাঁদের আলো! ফেরিওয়ালার ছেলে হলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কুলটির আদর্শের সাফল্যে খুশির জোয়ার

টিনের চাল, পলেস্তারা খসা দেওয়াল আর বাঁশের ঠেকনায় কোনোমতে টিকে থাকা ঘর—এটাই কুলটির সীতারামপুর বিশ্বকর্মা নগরের বাসিন্দা দুর্গেশ প্রসাদের ঠিকানা। পেশায় ফেরিওয়ালা দুর্গেশ প্রসাদের বাড়িতে এতদিন দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট থাকলেও, এখন সেখানে যেন চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, তাঁর বড় ছেলে আদর্শ প্রসাদ চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি (CA) ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই: দুর্গেশ প্রসাদ বাচ্চাদের জামাকাপড় ফেরি করে বিক্রি করেন। রোজ কাকভোরে সীতারামপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে ধানবাদে যান এবং সারাদিন কাজ শেষে ব্ল্যাক ডায়মন্ড ধরে বাড়ি ফেরেন। সামান্য রোজগারে স্ত্রী ও তিন সন্তানের সংসার টানতে হিমশিম খেতেন তিনি। তাঁর বাড়িতে কোনো টিভি, রেফ্রিজারেটর বা আধুনিক ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী নেই। এক প্রতিবেশী জানান, বাড়ির কর্তা বিলাসিতা এড়াতে কেবল লাইনও লাগাননি, কারণ ঘরে টিভিই ছিল না।
মেধাবী আদর্শের জয়: চরম দারিদ্রতার মধ্যেও পড়াশোনা ছাড়েননি আদর্শ প্রসাদ। সিএ ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি 53 শতাংশ নম্বর পেয়েছেন। তাঁর মেধায় মুগ্ধ হয়ে কুলটির বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা তাঁকে বিনা পয়সায় টিউশন পড়াতেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। গত ৩ নভেম্বর ফল প্রকাশের পর সেই কষ্টের ফল পেয়েছেন আদর্শ।
পরিবার ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন: সিএ পাশ করার পর খুশির হাওয়া বয়ে চলেছে প্রসাদ পরিবারে।
আদর্শ প্রসাদ বলেন: “অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবা আমাকে ফেরির কাজ করে পড়াশোনা করিয়েছেন। আগামী দিনে পরিবারকে নিয়েই চলতে চাই। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই ভালো চাকরি পাব, তারপর বাড়ির পরিবেশ আমি পাল্টাতে চাই।”
বাবা দুর্গেশ প্রসাদ: সন্তানদের সাফল্য দেখে আবেগাপ্লুত বাবা বলেন, “বৃষ্টির দিনে ঘরে জল পড়ে। দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট করে গেছি, যাতে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে। আজ ভালো লাগছে। আশা রাখব ও আমাদেরকে সঙ্গে নিয়েই চলবে।”
মা মায়া দেবী: ”খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। আদর্শ পরিবারের সবচেয়ে বড় ছেলে, তাই চাইব ও যেন নিজের দায়িত্ব থেকে সরে না-যায়।”
আদর্শের ভাই এবং বোন দু’জনেই বর্তমানে কলকাতায় অ্যাকাউন্টিং নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আদর্শের এই সাফল্যে তাঁর প্রতিবেশীরাও ভিড় জমিয়েছেন। তাদের একটাই প্রার্থনা—আদর্শ যেন বড় হয়ে তাঁর ‘আদর্শ’ না-ভুলে যায়।