মহালয়া থেকেই উৎসবের শুরু! এক নজরে কলকাতার সেরা কিছু দুর্গাপুজোর থিম জেনেনিন

আর মাত্র কয়েকটা দিন, তার পরেই মহালয়া। ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই দুর্গাপুজোর উন্মাদনা শুরু হয়ে যাবে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী ষষ্ঠী থেকে পুজো শুরু হয় (২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫), কিন্তু মহালয়ার পর থেকেই কলকাতার বড় বড় পুজো মণ্ডপগুলো দর্শনার্থীদের জন্য খুলে যায়। উৎসবের এই সময়ে মণ্ডপ পরিক্রমা, ভক্তি এবং কার্নিভাল একাকার হয়ে যায়। ২০২৩ সালে কলকাতার কিছু সেরা দুর্গাপূজা মণ্ডপ এবং তাদের থিমগুলির ঝলক রইল, যা প্রতিটি দর্শনার্থীর মনে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দেবে।

এক নজরে সেরা কিছু মণ্ডপের থিম
প্রতিটি পুজো মণ্ডপ যেন নিজেই একটি গল্প। এবারও ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাস, লোকশিল্প, দর্শন, এবং সামাজিক বার্তা – সবকিছুই ফুটে উঠেছে বিভিন্ন মণ্ডপের থিমে।

হাতিবাগান নবীন পল্লী: আমাদের দেশ, আমাদের দুর্গা
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই মণ্ডপের থিমটি গড়ে উঠেছে। অভিজিৎ ঘটকের এই থিমে ঔপনিবেশিক নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রতিটি নারীর মধ্যে দেবী দুর্গাকে দেখা যাবে।

হিন্দুস্থান পার্ক সর্বজনীন: চাদর বাদোনি
বাংলার বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্প ‘চাদর বাদোনি’-কে নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে এই মণ্ডপে। চার হাজার বছরের পুরোনো এই শিল্পকে ফিরিয়ে আনার এক অসাধারণ চেষ্টা।

সমাজসেবী সংঘ: পথের পাঁচালী ১৯৪৬
কলকাতার সামাজিক ইতিহাস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে এই থিমের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন শিল্পী প্রদীপ দাস। এটি যেন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি যা শহরকে বর্তমান রূপ দিয়েছে।

দক্ষিণদাঁড়ি ইয়ুথস: দহন (দ্য ফায়ারবর্ন)
অ্যাসিড হামলার শিকারদের উৎসর্গ করে তৈরি হয়েছে এই শক্তিশালী থিম। শিল্পী অনির্বাণ প্যান্ডেলওয়ালার এই মণ্ডপটি নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের ভাষা।

আলিপুর সার্বজনীন: চা-পান-উতার
চায়ের আবিষ্কার, পৌরাণিক কাহিনী এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে এই মণ্ডপ। একই সাথে এটি সেই সব যুদ্ধের ইতিহাসও মনে করিয়ে দেয়, যার সাক্ষী এই পানীয়।

টালা প্রত্যয়ের শতবর্ষ: সভ্যতার বীজ
এই বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মণ্ডপগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ১০০তম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে শিল্পী ভবতোষ সুতার ‘বীজ’কে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা সভ্যতা, ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরে।

বেহালা ফ্রেন্ডস: নবান্ন – ক্ষত, যুদ্ধ এবং ক্ষুধা
শিল্পী প্রদীপ দাস তাঁর থিমের মাধ্যমে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তার অদৃশ্য পরিণতির ওপর আলোকপাত করেছেন।

সন্তোষপুর লেকপল্লী: জলচিত্র (ওয়াশ)
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেঙ্গল স্কুলের ‘ওয়াশ’ কৌশলকে নতুন করে তুলে ধরেছে এই মণ্ডপ। একসময়ের এই শিল্প ভারতের সাংস্কৃতিক নবজাগরণকে সংজ্ঞায়িত করেছিল, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত।

দম দম তরুণ দল: সভ্যতার স্বাক্ষর
মানবতার যাত্রাপথে গুহাচিত্র থেকে শুরু করে বায়োমেট্রিক স্ক্যান পর্যন্ত সব কিছুই স্থান পেয়েছে এই থিমে। এটি সভ্যতার পরিচয়, স্মৃতি এবং গল্প বলার এক দারুণ প্রচেষ্টা।

হাতিবাগান সার্বজনীন: অথ ঘাট কথা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘ঘাটের কথা’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই মণ্ডপে কলকাতার পুরোনো ঘাটগুলির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যা একসময় শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল।

কাশী বোস লেন: পাকদণ্ডী
লীলা মজুমদারের জীবন ও লেখা থেকে অনুপ্রাণিত এই মণ্ডপটি শৈশব, গল্প এবং কল্পনার জগতকে তুলে ধরে।

ভোজন এবং উদযাপন
দুর্গাপুজো শুধু দেখার নয়, উদযাপনেরও। প্যান্ডেল পরিক্রমার পাশাপাশি ভোগ খাওয়া, মণ্ডপে মাইকে ভেসে আসা গান শোনা, এবং ধুনুচি নাচে অংশ নেওয়া পুজোর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিরিয়ানি, রোল, ফুচকা, ফিশ ফ্রাই-এর মতো নানা ধরনের খাবার স্টল থেকে শুরু করে বড় রেস্তোরাঁতেও ভূরিভোজের ব্যবস্থা থাকে।

পুজোর এই দিনগুলিতে কলকাতা যেন কখনো ঘুমায় না। মেট্রো পরিষেবা ২৪ ঘন্টা চালু থাকে, পুলিশ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে দর্শনার্থীরা নিরাপদে প্যান্ডেল ঘুরে দেখতে পারেন। ভিড় এড়াতে অনেকেই ভোরে বা গভীর রাতে প্যান্ডেল দেখতে বের হন। একটি জলের বোতল এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই পুজো উপভোগ করা সম্ভব।