এখানে নরবলির রীতিও ছিল! ৫০০ বছরের প্রাচীন জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় উমার সঙ্গে পূজিত হন দুই সখী

বাংলার অন্যান্য দুর্গাপূজার চেয়ে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পুজো কিছুটা আলাদা। এখানে মা দুর্গা তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়ার সঙ্গে পূজিত হন। এই দুই সখী মূলত শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এই বছর এই প্রাচীন পুজোটি ৫১৬তম বর্ষে পদার্পণ করল। রাজপরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তুঙ্গে।

বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির ইতিকথা
কথিত আছে, ১৫১০ সালে রায়কত বংশের দুই ভাই বিশু সিংহ ও শিশু সিংহ এই পুজোর প্রচলন করেন। সে সময় তাদের রাজধানী ছিল সুবর্ণপুরে। পরে জলপাইগুড়িতে রাজধানী স্থানান্তরিত হলে তিস্তা নদীর পাড়ে এই পুজো শুরু হয়। সেই ঐতিহ্য এবং নিয়ম আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হচ্ছে। এখানকার মা দুর্গা ‘কনক দুর্গা’ নামে পরিচিত। মায়ের প্রতিমায় লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ ও সরস্বতী ছাড়াও সিংহ ও বাঘের উপস্থিতি দেখা যায়।

পুজোর বিশেষ নিয়ম
রাজপরিবারের কুলদেবতা শ্রীকৃষ্ণ হওয়ায়, তার পুজো করার পরেই দুর্গাপূজার কাঠামো পুজো করা হয়। জন্মাষ্টমীর পরের দিন নন্দ উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী কাদা খেলার আয়োজন করা হয়। সেই খেলার মাটি দিয়েই দুর্গা প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়, যা উত্তরবঙ্গের এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য।

রাজপুরোহিত শিবু ঘোষাল জানান, এখানে কালিকাপুরাণ ও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে পুজো হয়। মহালয়ার দিন মা কালীর পুজো শেষে প্রতিমার চোখ আঁকা হয়। প্রতিমা তৈরির পর তাকে প্রথমে সুতির শাড়ি এবং পরে বেনারসি শাড়িতে সাজানো হয়।

ভোগ ও বলি প্রথা
এই পুজোর একটি অন্যতম বিশেষত্ব হলো, পুজোর চারদিনই মাকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত পোলাও, ফ্রাইড রাইস এবং বিভিন্ন ধরনের মাছ যেমন ইলিশ, বোয়াল ও চিতল দিয়ে ভোগ তৈরি হয়। দশমীর দিনে ভোগে ইলিশ মাছ, কচু শাক, পান্তা ভাত ও শাপলা দেওয়া হয়।

একসময় এখানে নরবলির প্রচলন থাকলেও, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন অর্ধরাত্রিতে চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো মণ্ড ও কুশ দিয়ে প্রতীকী বলি দেওয়া হয়। সেই সময় মণ্ডপ ঘিরে রাখা হয়, যেখানে শুধুমাত্র রাজপরিবারের সদস্যরাই প্রবেশ করতে পারেন। পাঁঠা বলির পাশাপাশি পায়রাও বলি দেওয়া হয়।

পর্যটকদের ভিড়
রাজবাড়ির এই প্রাচীন পুজো দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন। স্থানীয়দের কাছেও এই পুজো এক বিশেষ আবেগ। রাজপরিবারের সদস্য লিণ্ডা বসু বলেন, “দশমীর দিন এখানে লাখো মানুষের সমাগম হয়। মা নিজেই যেন সবাইকে ডেকে আনেন।” স্থানীয় বাসিন্দা ঋদম বর্মন এবং পর্যটক জানকী বিশ্বকর্মাও এই পুজোর ঐতিহ্য ও প্রস্তুতি দেখে মুগ্ধ।