দেবোত্তর সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে মালদায় ধুন্ধুমার, বিজেপি মহিলা পঞ্চায়েত সদস্যকে ধর্ষণ ও খুনের হুমকি

মালদা জেলার ইংরেজবাজার ব্লকে দেবোত্তর সম্পত্তি দখল করে তৃণমূলের পার্টি অফিস গড়ে তোলার প্রতিবাদ করায় এক বিজেপি মহিলা পঞ্চায়েত সদস্যকে ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে। এই গুরুতর অভিযোগ ঘিরে জেলার রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য এবং রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, বাগবাড়ি মৌজায় অবস্থিত শ্রী শ্রী লক্ষ্মী-নারায়ণ জিউ মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি (খতিয়ান নম্বর ৫০৪, জেএল নম্বর ৭৩) দখল করে তৃণমূল একটি পার্টি অফিস নির্মাণ করেছে বলে অভিযোগ। গ্রামবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে এই দখলের প্রতিবাদ করে আসছেন, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে এই জমিতেই গ্রামের সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয় বিজেপি মহিলা পঞ্চায়েত সদস্য এই দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ নেন এবং প্রশাসনের নজরে আনার চেষ্টা করেন।

হুমকি ও অভিযোগ:

অভিযোগকারী মহিলা পঞ্চায়েত সদস্য জানিয়েছেন, দেবোত্তর সম্পত্তি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার পরেই এলাকার দুই প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা তাঁকে তৃণমূল পার্টি অফিসে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে ধর্ষণ করার এবং তার ভিডিয়ো তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পরিবারকেও একই ধরনের খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যখন তাঁর স্বামী এবং এলাকার এক সমাজকর্মী এই হুমকির প্রতিবাদ করতে যান, তখন তাঁদের বোমা ও গুলি ছুঁড়ে খুনের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। প্রাণ বাঁচতে তিনি ও তাঁর পরিবার মালদা জেলা পুলিশ সুপার এবং ইংরেজবাজার থানার আইসি-র কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক তরজা ও তৃণমূলের আশ্বাস:

গোটা ঘটনা জানিয়ে ওই পঞ্চায়েত সদস্য ইংরেজবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং অভিযোগের প্রতিলিপি জেলা পুলিশ সুপার ও রাজ্য পুলিশের ডিজি-কেও পাঠিয়েছেন। পুলিশের তরফে গোটা বিষয়টি তদন্ত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মালদা জেলা তৃণমূলের তরফেও আশ্বাস মিলেছে যে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের শাস্তি হবে।

বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক অম্লান ভাদুড়ি এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই রাজ্যে এর আগেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা কতটা নীচ পর্যন্ত নামতে পারে, এই ঘটনা তার আরও একটা উদাহরণ। সবচেয়ে বড় কথা, কাজিগ্রামের বিষয়টি নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও, অভিযুক্তরা এখনও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর পুলিশ সুপার দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।”

পালটা জবাব দিয়ে তৃণমূলের জেলা মুখপাত্র আশিস কুণ্ডু দাবি করেন, “একটা কথা নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের শাস্তি হবেই। বাংলায় আইনের শাসন চলে। এটা উত্তরপ্রদেশ কিংবা হরিয়ানা নয়। আর বিজেপি কী বলল, কী ভাবল তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। পুলিশ নিজের কাজ করছে।”

পুলিশের বক্তব্য ও গ্রামবাসীদের উদ্বেগ:

মালদা জেলার পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদব জানিয়েছেন, “বিতর্কিত জমিটির মালিকানা নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিছু আইনি জটিলতাও রয়েছে।” বিজেপির মহিলা পঞ্চায়েত সদস্যকে ধর্ষণ ও খুনের হুমকির অভিযোগ নিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ করা হচ্ছে।”

গ্রামবাসীদের একাংশ জানিয়েছেন, মন্দিরের এই দেবোত্তর সম্পত্তিতেই গ্রামের সবাই দীর্ঘ বছর ধরে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে এবং এর নথিপত্রও রয়েছে। কিন্তু, কিছুদিন ধরে এলাকার কিছু জমি মাফিয়া এই জমিটি দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অভিযোগ, এই জমি মাফিয়াদের মদত দিচ্ছে তৃণমূলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং ব্লকের তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশও। এই ঘটনায় পুলিশ-প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই আপাতত তাকিয়ে রয়েছেন গ্রামবাসীরা। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।