থাইল্যান্ড-কাম্বোডিয়ার ধুন্ধুমার যুদ্ধ, নেপথ্যে এক প্রাচীন শিব মন্দির, এমন কী রয়েছে সেখানে?

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার মধ্যে তীব্র সীমান্ত সংঘাতের জেরে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে। ডানগ্রেক (Dangrek) পর্বতসঙ্কুল বিতর্কিত সীমান্ত এলাকা ঘিরে দুই দেশের মধ্যে তীব্র গুলি বিনিময়, রকেট হামলা, এমনকি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে বিমান হামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে, যার ফলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এই সংঘাতের মূলে রয়েছে বহু শতাব্দী প্রাচীন হিন্দু মন্দির, যা একসময় ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত ছিল এবং যার সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

থাইল্যান্ড-কাম্বোডিয়া সংঘাতের কারণ:
ডানগ্রেক পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্ত নিয়ে থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিবাদ। থাইল্যান্ডের অভিযোগ, সম্প্রতি ওই এলাকায় কাম্বোডিয়ার ড্রোন দেখা গেছে। এর পরপরই দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এই সীমান্ত বিবাদের বীজ বপন হয়েছিল ফরাসি উপনিবেশ থাকাকালীন সময়ে, যখন এলাকার সীমানা সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। এই বিতর্কিত এলাকাতেই রয়েছে একাদশ শতকে নির্মিত তিনটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির কমপ্লেক্স।

তা মুয়েন থম মন্দির কমপ্লেক্স:
থাইল্যান্ডের সুরিন জেলার থাই-কাম্বোডিয়া সীমান্তে ডানগ্রেক পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত প্রসাত তা মুয়েন থম (Prasat Ta Muen Thom) মন্দির কমপ্লেক্সটি ৩টি মন্দির নিয়ে গঠিত – তা মুয়েন থম, তা মুয়েন এবং তা মুয়েন তচ। ইতিহাসের দলিল অনুযায়ী, খামায় (Khmer) রাজ পরিবার এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করেছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, খামায় রাজা দ্বিতীয় উদয়াদিত্যবর্মণ প্রসাত তা মুয়েন থম মন্দিরটি ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরের গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গ রয়েছে এবং সংস্কৃত মন্ত্রও খোদাই করা আছে। ল্যাটেরাইট ও লোহিত মৃত্তিকা দিয়ে নির্মিত এই মন্দিরটির প্রবেশদ্বার দক্ষিণে, যা অন্যান্য খামায় মন্দিরের (সাধারণত পূর্বমুখী) থেকে আলাদা। মন্দিরের গায়ে হিন্দু দেব-দেবী ও গুপ্ত পরবর্তী যুগের ভারতীয় শিল্পকলার সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়, যা খামায় রাজবংশের সঙ্গে গুপ্ত বংশের শেষদিকের রাজাদের বা সমসাময়িক দক্ষিণ ভারতীয় রাজবংশগুলির সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়।

পরবর্তীকালে, খামায় রাজবংশ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করায় এই শিব মন্দিরটি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। প্রসাত তা মুয়েন ধীরে ধীরে মহাযানপন্থী বৌদ্ধদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। রাজা সপ্তম জয়বর্মণ এখানে ধর্মশালা, পান্থশালা এবং অন্যান্য স্থাপত্য নির্মাণ করেন। তা মুয়েন থমের কাছেই অবস্থিত প্রসাত তা মুয়েন তচ একটি হাসপাতাল হিসেবে এবং প্রসাত তা মুয়েন একটি পান্থশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

মন্দির এলাকা ঘিরে দ্বন্দ্ব:
এই মন্দিরগুলো যে এলাকায় অবস্থিত, তা নিয়ে কাম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। ফরাসি উপনিবেশের সময় তৈরি একটি ম্যাপে কাম্বোডিয়াকে থাইল্যান্ড থেকে আলাদা দেখানো হয়, যার ভিত্তিতে কাম্বোডিয়া এই এলাকার মালিকানা দাবি করে। থাইল্যান্ড অবশ্য সেই ম্যাপ অস্বীকার করে। এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও কঠোর নিয়মকানুন এবং সেনাবাহিনীর কড়া নজরদারি থাকে।

পূর্ববর্তী সংঘাত:
শুধুমাত্র এই মন্দির এলাকা নিয়ে নয়, অন্তত ১০০০ বছরের পুরনো প্রেয়া বিহার (Preah Vihear) মন্দির নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বহুবার সংঘর্ষ হয়েছে। এটিও ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত এবং পরে বৌদ্ধ মঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬২ এবং ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালত প্রেয়া বিহার মন্দিরের উপর কাম্বোডিয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দিলেও থাইল্যান্ড তা মানতে নারাজ। এই মন্দিরটিও ডানগ্রেক পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত এবং বর্তমানে এটি একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। খামায় রাজবংশের রাজা প্রথম সূর্যবর্মণ এটি নির্মাণ করেন এবং পরে দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের আমলে এর আকার বৃদ্ধি পায়।

বর্তমান সংঘাত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।