দেওয়া হবে ১০ লাখ! সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ…তৃণমূলের নয়া কৌশল কী হতে চলেছে দেখুন?

পঞ্চায়েত স্তরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক পরিষেবার প্রান্তিককরণ – এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার এক অভিনব কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ নামের এই প্রকল্পটি শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে জনসংযোগের এক নতুন হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ‘দুয়ারে সরকার’ এবং ‘পাড়ায় সমাধান’-এর সফলতার পর, এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এবার ‘মাইক্রো লেভেল’-এর তথ্য সংগ্রহ এবং সেই অনুযায়ী পরিষেবা প্রদানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা।

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষত মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এই উদ্যোগকে ‘অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা’ এবং ‘স্বনির্ভর বাংলা’ গড়ার পথে এক ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের দাবি, এই প্রকল্প ‘জন-কেন্দ্রিক বিপ্লব’ ঘটাবে, যেখানে নাগরিকরাই সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তাদের পাড়ার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ কোনটি।

কার্যপদ্ধতি এবং প্রত্যাশা:

প্রকল্পের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৮০,০০০ বুথের প্রতিটিকে ১০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করা হবে। এই অর্থের ব্যয়ভার কীভাবে হবে, তা বুথের মানুষ নিজেদের মতামত এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন। প্রতি তিনটি বুথকে নিয়ে একটি করে ক্যাম্প স্থাপন করা হবে, যেখানে ‘দুয়ারে সরকার’ ডেস্কও উপস্থিত থাকবে। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এই উদ্যোগকে ‘ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, “এই প্রথমবার, বাংলার মানুষ অর্থাৎ আপনিই ঠিক করবেন, আপনার পাড়ার জন্য কোনটা সবচেয়ে ভাল। এটাই হচ্ছে মা-মাটি-মানুষের সরকারের প্রকৃত অর্থ, যেখানে ক্ষমতা আপনার হাতে, আর যেখানে আপনার অগ্রাধিকারই হয়ে উঠবে আমাদের অগ্রাধিকার।”

রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের বক্তব্য, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো পরিষেবাগুলিকে একেবারে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়া। গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ স্তরের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি, ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পটি এমন ছোটখাটো সমস্যাগুলির সমাধান করবে যা বর্তমান পরিষেবাগুলির আওতায় আসে না। উদাহরণস্বরূপ, আইসিডিএস সেন্টারের পাঁচিল বা ছাদ নির্মাণ – এই ধরনের নির্দিষ্ট স্থানীয় চাহিদাগুলি এই প্রকল্পের মাধ্যমে পূরণ করা যাবে।

পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন:

যদিও শাসকদল এই প্রকল্পকে ‘তৃণমূল স্তরের ক্ষমতায়ন’-এর নয়া দিশা হিসেবে দেখছে, তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ এর বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ৮০,০০০ বুথে ১০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ, অর্থাৎ মোট প্রায় ৮০০ কোটি টাকার এই বিশাল অঙ্কের সঠিক ব্যয় এবং তদারকি কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একইসাথে, স্থানীয় স্তরে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কতটা দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে, তা-ও দেখার বিষয়। অতীতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ বা অপচয় নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পেও তার পুনরাবৃত্তি হবে কিনা, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তবে, যদি এই প্রকল্পটি তার ঘোষিত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে এবং সত্যিই নাগরিকদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তুলে দিতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আগামী দিনগুলিতে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং তার ফলাফলই বলে দেবে, এটি কি সত্যিই ‘জন-কেন্দ্রিক বিপ্লব’ নাকি আসন্ন নির্বাচনের আগে শাসকদলের জনসংযোগের এক নতুন কৌশল মাত্র।