‘ওকে মেরে ফেলা হয়েছে!’ ছাত্রী মৃত্যুতে অগ্নিগর্ভ ওড়িশা, বিস্ফোরক অভিযোগ বাবার

নিজের সম্মান বাঁচাতে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সাড়া মেলেনি। পথে বসে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাও আসেনি সমাধান। শেষমেশ অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজের গায়েই আগুন ধরিয়ে জীবন্ত দগ্ধ হয়েছিলেন ওড়িশার বিএড পাঠরতা এক তরুণী। শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া সেই ক্ষত নিয়ে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মঙ্গলবার রাতেই মারা গিয়েছেন বালেশ্বরের ফকির মোহন কলেজের বি.এডের দ্বিতীয় বর্ষের ওই ছাত্রী। এই ভয়াবহ ঘটনা গোটা দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। বিজেপি শাসিত ওড়িশায় এই ‘বিচারহীনতা’র বিরুদ্ধে ‘জাস্টিস’ চেয়ে রাজপথে নেমেছে ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ, প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে।
গণদগ্ধ এক প্রতিবাদ: ছাত্রীর বাবার বিস্ফোরক অভিযোগ
শনিবার বালেশ্বরের ফকির মোহন কলেজের ক্যাম্পাসেই গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মাত্র ২০ বছর বয়সী ওই ছাত্রী। বিভাগীয় প্রধানের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেই তিনি এই চরম পদক্ষেপ নেন বলে জানা গেছে। সহপাঠী দগ্ধ হয়ে শেষ হয়ে যাওয়ায় বীভৎস সেই দৃশ্য ভুলতে পারছেন না কলেজের পড়ুয়ারা।
মেয়ের মৃত্যুতে শোকে ও ক্রোধে থরথর করে কাঁপছেন মৃতার বাবা। সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ঘটনাটিকে একটি “ষড়যন্ত্র” বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কলেজ কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতাই তাঁর মেয়েকে এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র কাজ করছিল। কলেজে সে সবসময় সরব থাকত, তাই ওকে টার্গেট করা হয়েছিল। সবাই ওকে জোর করে মেরে ফেলল। এটা কি খুন নয়? ওরা ওকে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে বাধ্য করেছিল। কেন ওকে প্রিন্সিপালের ঘরে একা ডাকা হয়েছিল? ওই ঘরে কী ঘটেছিল? আমাদের কেন জানানো হয়নি?” প্রশাসনের কাছে এই সব প্রশ্নের জবাব দাবি করেছেন মৃতা ছাত্রীর বাবা। তিনি আরও জানান, “আমার মেয়ে পুরোপুরি মুখ খোলেনি কিন্তু জানিয়েছিল, অভিযুক্ত তাকে চাপ দিচ্ছে।”
প্রতিবাদের আগুন ও পুলিশের পদক্ষেপ
অত্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেও ন্যায়বিচার না পেয়ে অপমান এবং হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ওই ছাত্রী—এমনটাই অভিযোগ পরিবারের। বুধবার এই ঘটনার প্রতিবাদে ওড়িশায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভুবনেশ্বরে ওড়িশা বিধানসভার বাইরে বিজু জনতা দলের (বিজেডি) কর্মীরা বিশাল বিক্ষোভ দেখায়। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি এবং শিক্ষামন্ত্রী সূর্যবংশী সুরজের পদত্যাগ দাবি করে। সাধারণ মানুষও এই বিক্ষোভে সামিল হন। পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস এবং জলকামান প্রয়োগ করে।
বৃহস্পতিবার ওড়িশা বনধ, UGC-এর কমিটি
ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে বৃহস্পতিবার ওড়িশা বন্ধের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল। বিজেপি-শাসিত ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি দোষীদের কড়া শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। এদিকে, এই ঘটনার তদন্তে ৪ সদস্যের একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)।
এই ঘটনা আবারও নারী নিরাপত্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হেনস্থার মতো গুরুতর বিষয়ে সমাজের সচেতনতার অভাবকে প্রকট করে তুলল। দেশজুড়ে এই ঘটনার বিচার চেয়ে বাড়ছে চাপ।