পেটে ব্যথা: কোথায় ব্যথা হলে কী বুঝবেন এবং কখন সতর্ক হবেন?

পেটে ব্যথা কমবেশি সবারই হয়। কিন্তু সব সময় কি আপনার পেটের নির্দিষ্ট একটি স্থানেই ব্যথা করে? না, এমনটা নয়। ব্যথাটা পেটে হলেও, একেক সময় আমাদের পেটের একেক স্থানে ব্যথা অনুভূত হয়। কিন্তু কেন এমনটা হয়? পেটের ঠিক কোন জায়গায় ব্যথা হলে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে? চলুন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে নেওয়া যাক, যাতে আপনি নিজের শরীরের ভাষা বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।
১। পেটের উপরিভাগে ব্যথা: গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ
পেটের উপরিভাগে সাধারণত গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কারণেই ব্যথা অনুভূত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যথা ছাড়াও অন্যান্য উপসর্গ, যেমন— পেটে ঢেউয়ের মতো অনুভূত হওয়া, ঢেকুর ওঠা ইত্যাদি সমস্যা দেখা যায়। সাধারণত, খুব দ্রুত খাবার খেলে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ফলে এমনটা হয়ে থাকে। এই অবস্থায় অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং বেশি করে জল পান করুন। খুব বেশি ব্যথা অনুভূত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন।
২। বুকের নিচের অংশে, পেটের ওপরের অংশে ব্যথাবোধ ও জ্বালাপোড়া: বুক জ্বালাপোড়া বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স
সাধারণত, বুকের জ্বালাপোড়ার (Heartburn বা Acidity) কারণেই এমনটা হয়ে থাকে। আঠালো খাবার, অতিরিক্ত মশলাদার খাবার খাওয়ার কারণে এমনটা হয়। এছাড়াও, নির্দিষ্ট কিছু খাবারের কারণেও এমনটা হতে পারে এবং মুখে টক বা অ্যাসিডিক একরকমের স্বাদ পাওয়া যায়। এমনটা হলে সিগারেট, ভাজাপোড়া খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। একসাথে অনেক বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে খাবার খান। খুব বেশি আঁটসাঁট পোশাক পরা থেকেও বিরত থাকুন, কারণ এটি পেটে চাপ সৃষ্টি করে সমস্যা বাড়াতে পারে।
৩। পেটের ওপরের অংশে প্রচণ্ড ব্যথা: আলসারের ইঙ্গিত
ব্যথার আরও অনেক কারণ থাকতে পারলেও, বুকের ওপরের অংশে এই প্রচণ্ড ব্যথার কারণ হিসেবে আলসারকেও দায়ী করা যায়। পাকস্থলীতে আক্ষরিক অর্থেই কোনো সমস্যা তৈরি হলে, অর্থাৎ, পাকস্থলীর কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেক্ষেত্রে আলসার তৈরি হয়। আলসারের ক্ষেত্রে ব্যথা ছাড়াও ক্ষুধার অভাব, বমি বমি ভাব, কালচে বা রক্তযুক্ত মল, হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি হতে দেখা যায়। অতিরিক্ত ধূমপান, অ্যাসপিরিন, ইবুপ্রোফিন এবং অ্যালকোহল সেবনের কারণে এমনটা হতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা মদ্যপান, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে এবং যথেষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই ধরনের ব্যথা অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৪। পেটের ভেতরে কাঁপা এবং বমিভাব হওয়া: ইরিটেবল বাউল সিস্টেম (IBS)
আপনার খাবার হজম করার স্থানটি যদি অনেক বেশি স্পর্শকাতর ও দুর্বল হয় তাহলে এমনটা হতে পারে। ইরিটেবল বাউল সিস্টেম (Irritable Bowel Syndrome – IBS) নামেই এটি বেশি পরিচিত। এক্ষেত্রে মোট দুটো ব্যাপার হতে পারে: আপনার হজম ক্ষমতা অনেক দ্রুত কাজ করার ফলে ডায়রিয়া হতে পারে, আবার খুব ধীরগতিতে কাজ করার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর পেছনে কোনটি মূল কারণ, সেটা সম্পর্কে নিশ্চিত জানা না গেলেও চিকিৎসকেরা এক্ষেত্রে খাবারের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৫। ডায়রিয়া এবং পুরো পেটে ব্যথা বোধ করা: পাকস্থলীর ফ্লু
আপনার পেটে যদি খুব তীক্ষ্ণ ব্যথা থাকে, সাথে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, বমি, জ্বর এবং মাথাব্যথা থাকে, তাহলে এর কারণ হিসেবে পাকস্থলীর ফ্লু (Stomach Flu) কাজ করতে পারে। এক কথায় একে গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস বলা হয়। সাধারণত, দূষিত জল ও খাবার খাওয়ার ফলে এমনটা হয়ে থাকে। এটি থেকে দূরে থাকতে খাবার আগে হাত পরিষ্কার করে নিন। অন্যের ব্যবহৃত বাসনপত্র বা ব্যক্তিগত জিনিস ব্যবহার করবেন না। করলেও ভালোভাবে পরিষ্কার করে তারপর ব্যবহার করুন।
৬। হালকা ব্যথা ও হজমে সমস্যা: ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স
সাধারণত, ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্সের কারণে এমনটা হয়ে থাকে। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর মাথাব্যথা, অবসাদ, পেশী ও হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা, মুখের আলসার ইত্যাদি কারণে এমনটা হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রেই এমনটা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ল্যাক্টোজ নেই এমন খাবার খাওয়া উচিত বা ল্যাক্টেজ এনজাইম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
আপনার পেট ব্যথার কারণ হয়তো খুব ভয়াবহ কিছু নয়, তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। অবহেলা না করে তাই ব্যথার কারণ খুঁজে বের করুন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিন। এতে করে বড় রকমের কোনো সমস্যা থেকে দূরে থাকতে পারবেন আপনি।