বিশ্বজুড়ে ৫০ মিলিয়ন মানুষ মৃগীরোগে আক্রান্ত! জানুন কারণ ও প্রাথমিক লক্ষণ

মৃগীরোগ একটি দীর্ঘস্থায়ী মস্তিষ্কের রোগ, যা কোনো প্রকার জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয় না এবং এটি সব বয়সের মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ কোটি মানুষ মৃগীরোগে ভুগছেন। স্নায়বিক রোগগুলোর মধ্যে মৃগীরোগে আক্রান্তের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হঠাৎ খিঁচুনি হয়। এই খিঁচুনি হলো মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক ও অত্যধিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের আকস্মিক বৃদ্ধি, যা একজন ব্যক্তির চেতনা বা আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

ভারতের গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতালের এপিলেপসি প্রোগ্রাম ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের সহযোগী পরিচালক ডা. আত্মারাম বনসাল জানান, মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের খিঁচুনি হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— অনুপস্থিতির খিঁচুনি (যার ফলে পুরো শরীরে ঝিমঝিম অনুভূতি হতে পারে), টনিক খিঁচুনি (পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া), জটিল ফোকাল খিঁচুনি (যেখানে ব্যক্তি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না) এবং ফোকাল খিঁচুনি (যা মোচড়ানো বা অস্বাভাবিক স্বাদ বা গন্ধের মতো অনুভূতিতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে)।

এই বিশেষজ্ঞ মৃগীরোগের বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এর প্রধান কারণগুলো হলো—

সংক্রমণ: বিশ্বব্যাপী মৃগীরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মস্তিষ্কের সংক্রমণ। মস্তিষ্কে সংক্রমণের কারণে খিঁচুনি হতে পারে।
বংশগত কারণ: জিনগত বা বংশগত কারণেও মৃগীরোগের সম্ভাবনা থাকে।
জন্মের সময় অক্সিজেনের অভাব: জন্মের সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের কম মাত্রার কারণেও এই রোগ হতে পারে।
ইমিউন সিস্টেমের আক্রমণ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি ভুলবশত মস্তিষ্কের কোষগুলোকে আক্রমণ করে, তাহলেও মৃগীরোগ হতে পারে।
জন্মগত ত্রুটি: ডা. বনসালের মতে, জন্মগত ত্রুটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনে বাধা সৃষ্টি করে মৃগীরোগের একটি সাধারণ কারণ। এর মধ্যে ফোকাল কর্টিকাল ডিসপ্লাসিয়া, পলিমাইক্রোজিরিয়া ও টিউবারাস স্ক্লেরোসিসের মতো ত্রুটি উল্লেখযোগ্য। মস্তিষ্কের অন্যান্য অস্বাভাবিকতাও মৃগীরোগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
মাথায় আঘাত ও মস্তিষ্কের ক্ষতি: মাথায় গুরুতর আঘাতের পর মস্তিষ্কে দাগ সৃষ্টি হলে, স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হলে এবং মস্তিষ্কে টিউমার হলেও মৃগীরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
মৃগীরোগের প্রাথমিক লক্ষণ:

খিঁচুনির ধরনের ওপর নির্ভর করে একজন ব্যক্তির উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। তবে বারবার খিঁচুনি হওয়া মৃগীরোগের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ। খিঁচুনি হওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন—

১. চেতনা হারানো
২. পেশির অনিয়ন্ত্রিত গতিবিধি
৩. যোগাযোগ ও বুঝতে সমস্যা
৪. ভয় ও উদ্বেগ অনুভব করা
৫. শ্বাসকষ্ট হওয়া
৬. হঠাৎ হাত কাঁপা
৭. হাত থেকে জিনিস পড়ে যাওয়া
৮. একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ইত্যাদি।

মৃগীরোগে আক্রান্তদের কীভাবে সাহায্য করবেন:

যদি কেউ খিঁচুনিতে ভোগেন, তাহলে কিছু সহজ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

আক্রান্ত ব্যক্তি যেন স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারে তা নিশ্চিত করুন।
যদি মুখ নিচের দিকে থাকে, তবে তা সাবধানে উপরের দিকে ঘুরিয়ে দিন, এতে শ্বাস নিতে সুবিধা হবে।
খিঁচুনির সময় আক্রান্তের মুখে পানি, ওষুধ বা কোনো খাবার দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, কারণ প্রতিক্রিয়াহীন অবস্থায় খাবার গলায় আটকে দম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ব্যক্তির ঝাঁকুনিপূর্ণ গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না। এতে তাদের আঘাত লাগতে পারে। খিঁচুনি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ধরে রাখার চেষ্টা করবেন না।
একটি নরম তোয়ালে বা কুশন তাদের মাথার নিচে রাখুন, যাতে অনৈচ্ছিক নড়াচড়ার সময় তাদের মাথায় আঘাত না লাগে।
যদি আপনি কারো খিঁচুনি হতে দেখেন, তবে এই সহজ পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করে একটি জীবন বাঁচাতে পারেন। তবে গুরুতর সমস্যা মনে হলে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।