SSKM-ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন AIIMS! অবশেষে রাজ্যের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পদে কামব্যাক প্রখ্যাত চিকিৎসক অরুণ সিংয়ের

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে একদা রাজ্যের সরকারি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তবে দীর্ঘ ১৪ বছর পর অবশেষে সসম্মানে স্বভূমে প্রত্যাবর্তন ঘটল দেশের অন্যতম সেরা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ তথা নিওন্যাটোলজিস্ট, এসএসকেএমের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডাঃ অরুণ কুমারেন্দু সিংয়ের। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দফতরের উপদেষ্টা পদে মর্যাদাপূর্ণ নিয়োগ দিল।

বুধবারই রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের তরফে এই সংক্রান্ত একটি অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। নবান্ন ও স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রধানত রাজ্যের শিশুস্বাস্থ্য পরিষেবাকে বিশ্বমানের করে তোলা এবং শিশুমৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই প্রবীণ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসককে যুক্ত করা হল।

কে এই ডাঃ অরুণ কুমারেন্দু সিং?

শিশুরোগ চিকিৎসা বিশেষ করে নবজাতকদের চিকিৎসায় (Neonatology) বিপ্লব ঘটানো এক প্রখ্যাত নাম ডাঃ অরুণ কুমারেন্দু সিং:

  • এসএসকেএমে ইতিহাস: ১৯৯৯ সালে দিল্লির এইমস (AIIMS) থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি কলকাতার এসএসকেএম (পিজি) হাসপাতালে যোগ দেন। সেই সময় পিজিতে নবজাতকদের জন্য আলাদা কোনও নিওন্যাটোলজি বিভাগ ছিল না। তাঁরই একক প্রচেষ্টায় এবং উদ্যোগে পিজিতে পৃথক নিওন্যাটোলজি বিভাগ চালু হয়, যা পরবর্তীতে হাজার হাজার মুমূর্ষু শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছে।

  • বিশ্বখ্যাত ‘পুরুলিয়া মডেল’: শুধু শহরের হাসপাতালেই তিনি তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ রাখেননি। গ্রাম বাংলায় শিশুমৃত্যুর হার কমাতে ২০০৩ সালে পুরুলিয়ায় অসুস্থ নবজাতকদের জন্য তিনি একটি বিশেষ ইউনিট গড়ে তোলেন। এই অভিনব উদ্যোগই আন্তর্জাতিক চিকিৎসা জগতে ‘পুরুলিয়া মডেল’ নামে খ্যাতি পায়, যা আজও ভারতসহ একাধিক দেশে অনুসরণ করা হয়।

কেন মমতা জমানায় রাজ্য ছেড়েছিলেন তিনি?

স্বাস্থ্যভবন সূত্রের খবর, ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ, সেই কমিটির তৎকালীন শাসকদল ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী সদস্যের সঙ্গে নীতিগত মতবিরোধ তৈরি হয় ডাঃ অরুণ সিংয়ের।

তারপরেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে কামারহাটির সাগরদত্ত হাসপাতালে বদলি করা হয়। মর্মান্তিক বিষয় হলো, সেই সময় সাগরদত্ত হাসপাতালে নবজাতকদের বিশেষ চিকিৎসার (নিওন্যাটোলজি) কোনও অবকাঠামোই বিদ্যমান ছিল না। এই অপমান ও রাজনৈতিক বঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে রাজ্য সরকারের চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এই প্রথিতযশা চিকিৎসক।

যোধপুর এইমস থেকে পুনরায় বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পথ

রাজ্য সরকারের চাকরি ছাড়লেও থমকে থাকেনি তাঁর পথচলা। তিনি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ‘রাষ্ট্রীয় বালস্বাস্থ্য কার্যক্রম’ (RBSK)-এর উপদেষ্টা পদে যুক্ত হন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি যোধপুর এইমসের নিওন্যাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন।

পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের দিকে জন্মের সময় মায়ের নাড়ির সঙ্গে শিশুর সংযোগ রক্ষাকারী ‘ইনট্যাক্ট কর্ড’ (Intact Cord) প্রযুক্তির ওপর রাজ্যের সরকারি চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। তবে স্থায়ীভাবে বাংলায় ফেরেননি। ২০২৬ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিজেপি সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে এই অভিজ্ঞ চিকিৎসককে রাজ্যে ফিরিয়ে আনলেন। রাজ্যের শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মোড় ঘোরাতে তাঁর এই পদায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে চিকিৎসা মহল।