“৪ মাস না যেতেই বড় ধাক্কা!”-একের পর এক বিতর্কে জর্জরিত রাজ্য সরকার, জানুন রিপোর্ট কার্ড

সরকারের মেয়াদ এখনও চার মাস পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যেই একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে চরম অস্বস্তির মুখে পড়েছে রাজ্যের সরকার। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, কখনো দলের রাজ্য সভাপতিকে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে, আবার কখনো খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে পর্যন্ত ক্ষমা চাইতে হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি এখন গেরুয়া শিবিরের অন্দরেই নানা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে নেতৃত্বকে।
‘ভাল তৃণমূল’ বিতর্ক ও অন্দরের ক্ষোভ
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন ‘ভাল তৃণমূলীরা দলে স্বাগত’। দলের অন্দরেই প্রশ্ন ওঠে, পুরনো লড়াইয়ের পর তবে কি শুধু দল ভাঙাতেই এত আয়োজন? এরপর দিল্লির রাজনীতিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তৃণমূল সাংসদদের এনসিপিআই-তে যোগদান ও এনডিএ-কে সমর্থন করার ঘটনা সেই আগুনে ঘি ঢালে। বিরোধীরা মুকুল রায়ের পুরনো মন্তব্য মনে করিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি।
যদিও শমীক ভট্টাচার্য পরে অবস্থান বদল করেন, তবুও দলের অন্দরে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। দলের এক সিনিয়র নেতা জানান, বহু মানুষ দলে ঢুকলেও অনেকেই আরএসএস বা বিজেপির আদর্শ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূলেই আগের মতো অতি হিন্দুত্ব বা তোষণ দেখিয়ে পদ পাওয়ার মানসিকতা কাজ করছে। সঙ্ঘের মুখপত্রেও এ বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের মনে যদি এমন ধারণা জন্মায় যে এই দলও পুরনো দুর্নীতির পন্থী, তবে ৯০ শতাংশ ভোটার মুখ ফিরিয়ে নিতে এক মুহূর্তও ভাববে না।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাম বদলের বিতর্ক
এর পর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে এবিভিপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ ও সংঘাতের আবহে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাফ জানিয়ে দেন যে এবিভিপির সঙ্গে বিজেপির কোনো দাপ্তরিক যোগ নেই। এর কিছুদিন বাদেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলে ঋষি অরবিন্দের নামে করার দাবি তোলেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। এই ঘটনায় অস্বস্তি এড়াতে শমীকবাবু ফের স্পষ্ট করে দেন যে এটি দলের কোনো কর্মসূচি নয়, সম্পূর্ণভাবে ওই বিধায়কের ব্যক্তিগত মত।
অগ্নিমিত্রা পলের দুধ বিতর্ক ও মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ
ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গিয়ে চরম বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল। রাস্তায় নিজের সন্তানের জন্য দুধ ফোটাচ্ছিলেন এক মহিলা—তাঁকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী। নাগরিক নিরাপত্তার যুক্তি থাকলেও, ফুটপাতবাসিনী ওই মায়ের প্রতি মন্ত্রীর এই আচরণ নিয়ে নেটমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র ছিছিক্কার। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সিপিএমের প্রতিনিধিদলও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আসরে নামেন। তিনি ওই মহিলা রশিদার সঙ্গে দেখা করে জীবিকা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন এবং মন্ত্রী অগ্নিমিত্রাও নিজের ভুল স্বীকার করেন।
আমিষ বিতর্ক ও বাবা বাগেশ্বরের মন্তব্য
দুধ বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজ্যে দানা বাঁধে নতুন আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পুজো নির্দেশিকা এবং বাংলায় এসে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী ‘দুর্গাপুজোয় মাংস খাওয়া লোকেরা পাপী’ বলে মন্তব্য করায় নতুন করে শোরগোল শুরু হয়। শক্তিপুজোর বাংলায় বাঙালিকে নিরামিষাশী করার চক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। যদিও শমীক ভট্টাচার্য স্বামী বিবেকানন্দের প্রসঙ্গ টেনে বাঙালি আমিষ খাবে বলেই স্পষ্ট করেন, তবুও বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে—যেহেতু খোদ মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে ওই সাধুর সঙ্গে দেখা গেছে, তাই এই দায় এড়ানো যায় না।
দেবীর ১১ হাত বিতর্ক ও বিজেপির অন্দরমহল
সবশেষে দুর্গাপুজোর একটি সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবীর ১১টি হাত দেখানো নিয়েও চরম সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এই ঘটনায় বিরোধীদের আক্রমণ সামলাতে শমীকবাবু হালকা চালে বলেন যে “মা আরও শক্তিশালী হয়ে গিয়েছেন”, তবে শেষ পর্যন্ত এর জন্য ক্ষমা চাইতে হয় খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যখন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজকে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও প্রতীক বদলের মতো অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলি আদতে দলের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দলের একাংশও মনে করছে, এই ধরণের বিতর্ক এড়ানো না গেলে আগামী দিনে রাজনৈতিক পথে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।