১৮ বছরের সাম্রাজ্যে বড় আঘাত? প্রাক্তন সেনাপ্রধানের শক্ত চ্যালেঞ্জে কোণঠাসা নেতানিয়াহু, কী বলছে বুথফেরত সমীক্ষা?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সেই রক্তক্ষয়ী ও অতর্কিত হামলার পর প্রথমবারের মতো সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে ইজরায়েল। এই ঐতিহাসিক ও টানটান উত্তেজনার ভোটের ফলাফলের ওপরই ঝুলে রয়েছে দেশটির দীর্ঘতম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
ইজরায়েলের ১২০ আসন বিশিষ্ট সংসদ ‘নেসেট’-এর বর্তমান মেয়াদের শেষ দিন ছিল ১৭ জুলাই। এর আগে ২০১৯ সালে শেষবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইজরায়েলের বিগত ৩৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নেসেট পুরো মেয়াদ সম্পন্ন করে নির্বাচনে গেল। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সামরিক পরিস্থিতির নিরিখে এই ষষ্ঠ নেসেট নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
নেতানিয়াহু বনাম বিরোধীদের প্রচারের মূল সুর
টানা ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নেতানিয়াহু ভোটারদের দরবারে তাঁর সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরছেন। তাঁর মূল প্রচারের বিষয়বস্তু হলো— হামাসের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি বাহিনীর তীব্র অভিযান, হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি চুরমার করা এবং ইরানের মাটিতে সরাসরি আঘাত হানা। নেতানিয়াহু দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক নানা চাপ উপেক্ষা করে তিনি দেশের শত্রুদের কোণঠাসা করেছেন এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করেছেন।
অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ শিবিরের মূল অস্ত্র ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা। বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, নেতানিয়াহুর সরকারের অদূরদর্শিতার কারণেই হামাস সেদিন দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে হামলা চালাতে পেরেছিল। তদুপরি, সেই গাফিলতির দায় স্বীকার করতেও অস্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু এবং ঘটনার তদন্তে কোনো স্বাধীন সরকারি কমিশন গঠন করতে দেননি। একইসঙ্গে অপহৃতদের উদ্ধার চুক্তিতে দেরি করার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হচ্ছে।
কীভাবে নির্বাচিত হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?
ইজরায়েলে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকে (যেমন নেতানিয়াহু বা তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট) সরাসরি ভোট দেন না; তাঁরা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। নিয়ম অনুযায়ী, ১২০ আসন বিশিষ্ট নেসেটে যে জোট অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন একত্র করতে পারবে, সেই জোটের প্রধানকেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হবে।
প্রতিপক্ষ কে? গাদি আইজেনকোটের লড়াই
নেতানিয়াহুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট ইজরায়েল সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান। ৭ অক্টোবরের সংকটের পর তিনি জরুরি সরকারের অংশ হলেও, পরবর্তীতে গাজা যুদ্ধ পরিচালনার নীতি নিয়ে মতভেদের জেরে পদত্যাগ করেন।
আইজেনকোটের এই লড়াই কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অত্যন্ত ব্যক্তিগতও। গাজায় ইজরায়েলি সেনা অভিযানে তিনি তাঁর নিজের ছেলে ও দুই ভাইপোকে হারিয়েছেন। ফলে নিরাপত্তা রক্ষা এবং জাতীয় সুরক্ষার দায়িত্ব সমানভাবে বণ্টন করার বিষয়ে তাঁর দাবি ইজরায়েলি সমাজে এক গভীর আবেগীয় মাত্রা পেয়েছে। ক্ষমতায় এলে ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার তদন্তে বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
জনমত সমীক্ষা ও ভোটারের সমীকরণ
বিভিন্ন শেষ দফার জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর জোটের তুলনায় বিরোধী দলগুলির সম্মিলিত আসন সংখ্যা বেশি হতে পারে। তবে বিরোধীদের মধ্যেও নানাবিধ ফাটল রয়েছে— বিভিন্ন ডানপন্থী ও উদারপন্থী দলের আদর্শগত মতপার্থক্য, নেতৃত্বের লড়াই এবং সরকার গড়ার ক্ষেত্রে ‘আরব দলগুলোর’ সমর্থন নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে তৈরি বিভাজন। ফলে নির্বাচনে বেশি আসন পেলেও শেষ পর্যন্ত বিরোধীরা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কতখানি সফল হবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ‘ইজরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায়৬৮ শতাংশ ইহুদি ভোটার মনে করছেন ৭ অক্টোবরের হামলা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বড় প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে দেশের অন্দরে ক্রমবর্ধমান অপরাধ নিয়ে উদ্বিগ্ন আরব-ইজরায়েলি সম্প্রদায়ের ভোটাররাও।
নির্বাচনের পর কী হতে পারে ইজরায়েলে?
নেতানিয়াহু জয়ী হলে: লিকুদ পার্টি ও তার অতি-ডানপন্থী এবং আল্ট্রা-অর্থোডক্স শরিকরা ৬১টি আসন পেলে নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় থাকবেন। সেক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার সংস্কার, সেনায় বাধ্যতামূলক নিয়োগ নীতি ও পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের মতো বিষয়ে কট্টরপন্থীদের প্রভাব ব্যাপকভাবে বাড়বে।
আইজেনকোটের জোট সরকার: বিরোধী জোট যদি আরব দলগুলির বাইরের সমর্থনে সরকার গঠন করে, তবে তা বেশ ভঙ্গুর ও অস্থির হতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পুনরায় নির্বাচন: কোনো দলই যদি ৬১টি আসনের জাদুকরী সংখ্যা স্পর্শ করতে না পারে, তবে নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থেকে যাবেন। সেক্ষেত্রে দেশকে আবারও এক নতুন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে, ঠিক যেমনটি ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যকার অস্থির সময়ে ঘটেছিল।