১৬০ বছরে পা দিল কাটোয়ার রাজকীয় সাহা বাড়ির পুজো! রূপোর অস্ত্র আর বেলজিয়াম ঝাড়বাতির রোশনাইয়ে মুগ্ধ শহর

প্রাচীন ঐতিহ্য, জাঁকজমক এবং পারিবারিক আভিজাত্যের সুদীর্ঘ ধারা বজায় রেখে প্রতিবারের মতো এবছরও মহাসমারোহে উদযাপিত হতে চলেছে কাটোয়া শহরের অত্যন্ত বিখ্যাত ‘সাহা বাড়ির’ দুর্গাপুজো। কাটোয়াবাসী তথা সমগ্র বর্ধমান জেলার মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় এই বনেদি পারিবারিক পুজোটি এ বছর অত্যন্ত গৌরবের সঙ্গে পা দিল তার ১৬০তম বর্ষে। শারদোৎসবের শুভ দিনগুলোতে এই বিশাল বনেদি বাড়ির প্রাচীন ইতিহাসকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখতে এবং শতাব্দীপ্রাচীন পুজোর অনন্য রূপ উপভোগ করতে রাজ্যের কোণ থেকে উপচে পড়ে হাজার হাজার মানুষের ঢল।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, সাহা পরিবারের দূরদর্শী পূর্বপুরুষ ও খ্যাতনামা ব্যবসায়ী কালীদাস সাহা তাঁর ব্যবসার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্যে এই দুর্গাপুজোর শুভ সূচনা করেছিলেন। চুন-সুরকির অত্যন্ত মজবুত ও প্রাচীন গাঁথনিতে তৈরি সুবিশাল এই পুজোবাড়িটি কালের বহু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে আজও অবিকল আগের মতোই সম্পূর্ণ অটুট ও স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও, এই পরিবারের পুজোর মূল প্রাণকেন্দ্র হলো তার পুরনো ঐতিহ্য। শতবর্ষের পুরনো সমস্ত প্রাচীন রীতি ও কঠোর নিয়ম মেনেই আজও এখানে দেবীর প্রতিটি আচার ও পুজো নিখুঁতভাবে পালিত হয়।

সাহা বাড়ির এই ঐতিহাসিক পুজোবাড়িটির স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে এক বিশেষ ও নান্দনিক বৈচিত্র্য, যা সচরাচর বর্তমান যুগে দেখা যায় না। প্রাচীনকালে রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার কারণে বাড়ির নারীরা বা মহিলারা জনসমক্ষে আসতেন না। তাঁদের দুর্গোৎসব দেখার ও অঞ্জলি দেওয়ার সুবিধাার্থে তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশেষ ও দৃষ্টিনন্দন ঝুলবারান্দা। সেই ঝুলবারান্দার অসংখ্য ছোট-বড় জানলা দিয়ে বাড়ির মহিলারা আড়াল থেকে দেবীকে প্রণাম জানাতেন এবং পুজোর সমস্ত আনন্দ একসঙ্গে উপভোগ করতেন। পাশাপাশি, অতীতে দূর-দূরান্ত থেকে আগত ক্লান্ত দর্শনার্থীদের আরাম ও বিশ্রামের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এক সুপরিসর উন্মুক্ত বারান্দা, যা আজও তৎকালীন আতিথেয়তার এক অনন্য নিদর্শন বহন করছে।

বর্তমানকালেও দুর্গাপুজোর এই ক’দিন পুরো প্রাসাদোপম সাহা বাড়িটি সেজে ওঠে ইউরোপিয়ান স্টাইলের বেলজিয়ামের দামি কাঁচের ঝাড়বাতির চোখধাঁধাঁনো রোশনাইয়ে। শুধু তাই নয়, মা দুর্গার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র এবং দৈনন্দিন পুজোর বিভিন্ন সামগ্রী সম্পূর্ণ খাঁটি রূপো দিয়ে তৈরি, যা এই পূজার জাঁকজমককে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সাহা পরিবারের এই সুপ্রাচীন বনেদি আভিজাত্য, সংস্কৃতি এবং অনন্য ঐতিহ্য আজ কাটোয়ার দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রধান এবং সেরা আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।