১০ হাজার টাকার বেতনে কোটি টাকার প্রাসাদ! সন্তোষপুরের ‘হাতি বাড়ি’ ঘিরে রহস্যের পাহাড়

সদর দরজার ঠিক উপরে প্রকান্ড এক হাতির মাথা। তার ওপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক বিলাসবহুল চারতলা ইমারত। আভিজাত্য আর জাঁকজমকে মোড়া সন্তোষপুর অ্যাভিনিউয়ের ১৭৫/১ নম্বরের এই বাড়িটি দেখলে যে কারও চোখ ধাঁধিয়ে যেতে বাধ্য। পথচলতি মানুষ অন্তত একবার থমকে দাঁড়িয়ে ভাবেন, এ যেন আস্ত এক রাজপ্রাসাদ! স্থানীয়দের কাছে এই অট্টালিকাটি ‘হাতি বাড়ি’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। এই চর্চিত বাড়ির বর্তমান বাসিন্দা হলেন কলকাতা পুরসভার ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু একজন কাউন্সিলরের আয়ের সঙ্গে এই বিপুল সম্পত্তির বহর কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে এখন শহরজুড়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা ও বিতর্ক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাত্র চার বছর আগেও এই জায়গায় একটি সাধারণ দোতলা বাড়ি ছিল। কিন্তু কালক্রমে সেখানে গড়ে উঠেছে এই সুউচ্চ প্রাসাদ। স্থানীয়দের তথ্যানুসারে, দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে এর অন্দরমহল সাজানোর কাজ। গোটা বাড়ি দামি মার্বেল পাথরে মোড়া। চারতলা এই অট্টালিকায় ওঠানামার জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক লিফট, রয়েছে নজরকাড়া এক ‘গ্লাস রুম’ বা সম্পূর্ণ কাচ দিয়ে ঘেরা ঘর। সেই সঙ্গে বহুমূল্য আসবাবপত্র ও বিলাসবহুল পরিকাঠামো এই বাড়ির জাঁকজমক কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মূল বিতর্কের সূত্রপাত এখানেই—একজন পুর-কাউন্সিলরের মাসিক সরকারি ভাতা মাত্র ১০ হাজার টাকা। এই সামান্য ভাতায় কীভাবে এমন কোটি টাকার ব্যয়বহুল নির্মাণ সম্ভব হলো? প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক সমালোচকরা। যদিও অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত এবং একাধিক সিরিয়াল ও সিনেমায় কাজ করেছেন, তবুও কেবল অভিনয়ের আয় দিয়ে এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়া আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। সম্পত্তির প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব ও উৎসের স্বচ্ছতা নিয়ে এখন সরব বিভিন্ন মহল।

এই ‘হাতি বাড়ি’ নিয়ে বিতর্কের ইতিহাস অবশ্য বেশ পুরনো। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিজেপি নেতা সজল ঘোষ এই বাড়ি নির্মাণের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছিলেন। নথি পেশ করে তিনি দাবি করেছিলেন, মিনু রানি ভাওয়াল নামে এক মহিলার কাছ থেকে শুরুতে দোতলা বাড়িটি কিনেছিল অনন্যার পরিবার। অভিযোগ, পরবর্তীতে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই সেটিকে পাঁচতলা করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই বাড়ির পিছনের জমিও কিনে নিয়ে সেখানে আরও একটি পাঁচতলা ইমারত তুলে সামনের বাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও পদ্মশিবিরের দাবি।

বিজেপি নেতার তোলা সেই গুরুতর অভিযোগের আইনি নিষ্পত্তি না হলেও, বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সন্তোষপুরের বুকে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিলাসবহুল ‘হাতি বাড়ি’ ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে কৌতূহল ও প্রশ্ন। আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার এই আকাশ-পাতাল পার্থক্যের উৎস কী, তা নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী পক্ষ। সব মিলিয়ে ‘হাতি বাড়ি’-র ঝকঝকে দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি তুলেছেন অনেকেই।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty