হরমুজ সংকটের মাঝেই চিন আবিষ্কার করল নতুন রুট! মাত্র ২০ দিনেই ইউরোপে পৌঁছবে পণ্য

হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে চলা দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মাঝেই ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য একেবারে নতুন এক সমুদ্রপথ চালু করল চিন। ভূ-রাজনৈতিক অশান্তি এড়িয়ে বাণিজ্যের গতি সচল রাখতে বেজিং এখন ব্যবহার করছে ৩,৪০০ মাইল বা প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আর্কটিক ‘আইস সিল্ক রোড’ বা ‘বরফ রেশম পথ’। রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে এবং আর্কটিক মহাসাগরের বুক চিরে চলা এই রুটটি প্রচলিত সুয়েজ খালের তুলনায় সময় প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।
চলতি বছরের ১৫ আগস্ট, চিনা কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি ‘সি লিজেন্ড’ এই রুটে তাদের প্রথম নিয়মিত সাপ্তাহিক পরিষেবা চালু করেছে। এই রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলি চিনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে সোজা যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে প্রায় ৭০ মাইল উত্তরে অবস্থিত ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছয়। প্রথাগত সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে যেখানে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে, সেখানে এই নতুন বরফ রেশম পথে সময় লাগবে মাত্র ২০ দিন।
নতুন এই রুট কেন জরুরি হয়ে উঠল? গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি, লোহিত সাগরের সংলগ্ন বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার হুমকিতে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়। অনেক কার্গো জাহাজকেই বাধ্য হয়ে কেপ অব গুড হোপের মতো সুদীর্ঘ বিকল্প পথ ধরতে হয়, যার জেরে জ্বালানি খরচ, বীমার প্রিমিয়াম এবং সামগ্রিক পরিবহনের সময় এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যায়। এই সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট কাটাতে উত্তর সমুদ্রপথের গুরুত্ব চিনের কাছে এক লাফে বহুগুণ বেড়ে গেছে।
যদিও এই রুটটি নতুন কিছু নয়, ২০১৩ সালেই প্রথম চিনা পণ্যবাহী জাহাজ ‘ইয়ং শেং’ এই পথ দিয়ে ইউরোপে পা রেখেছিল। তবে এতদিন পর্যন্ত আর্কটিকের দুর্ভেদ্য পুরু সামুদ্রিক বরফের কারণে বছরভর এই পথে নিয়মিত জাহাজ চালানো সম্ভব হতো না।
বরফ গলে খুলেছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে আর্কটিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে সাগরের বরফ দ্রুত গলতে শুরু করেছে। এর ফলে ‘নর্দার্ন সি রুট’ (এনএসআর) এখন বছরের অনেকটা সময় ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠছে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর মেরুতে বরফ গলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই রুটটিকে পাকাপাকিভাবে সারা বছর ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে চিনের সংস্থাসগুলি যাতায়াতের বর্তমান মৌসুমকে প্রথমে তিন এবং পরবর্তীতে চার মাস করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে কিছু কৌশলগত ঝুঁকিও বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক হলেও এই ‘আইস সিল্ক রোড’ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। প্রথমত, এই সম্পূর্ণ জলপথটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনাধীন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন ‘রোসাটম’ এই রুটে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি জাহাজ চলাচল তদারকি করে এবং প্রয়োজনমতো আইসব্রেকার বা বরফভাঙা জাহাজ সরবরাহ করে। ফলে এই ক্ষেত্রে চিনকে অনেকটাই মস্কোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি চিনকে মালাক্কা প্রণালীর ওপর তাদের ঐতিহাসিক নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে, যেখান দিয়ে বর্তমানে চিনের মোট আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সুয়েজ খাল বা অন্যান্য প্রচলিত সমুদ্রপথের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে এখনও আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি এই বরফ পথ। ২০২৪ সালে মাত্র ১৫টি এবং ২০২৫ সালে মাত্র ২৩টি কন্টেইনারবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছিল। তীব্র বরফাবৃত প্রতিকূল আবহাওয়া, বেশি খরচ, পরিবেশগত সংবেদনশীলতা এবং রাশিয়ার ওপর ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরশীলতার মতো কারণগুলি এখনও এর সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্যতার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।