‘স্যার’ বলত যারা, তারাই কেড়ে নিল প্রাণ! রংপুরে শিক্ষক দম্পতি সহ একই পরিবারের চারজনকে খুনের ঘটনায় চাঞ্চল্য

বাংলাদেশের রংপুরে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ৬৫ বছর বয়সি গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, কন্যা এবং ১২ বছরের নাবালক পুত্রকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে খুন করার অভিযোগ উঠেছে তাঁদেরই একসময়ের পরিচিত ও পাড়ার দুই যুবকের বিরুদ্ধে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে, অভিযুক্তরা চক্রবর্তী পরিবারের পূর্বপরিচিত ছিল এবং তারা সম্পর্কে খুড়তুতো ভাই। তুচ্ছ একটি ঘটনার জেরে ঘটে যাওয়া এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডটি সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ধৃত দুই যুবকের নাম মুগ্ধ দাস (২৩) এবং সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা রংপুরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীদের নতুন বাড়ির ঠিক পাশেই থাকত। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুই যুবক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ বলে ডাকত এবং তাঁর স্ত্রীকে ‘কাকি’ সম্বোধন করত। অভিযুক্তদের ভাইয়েরা নিহত শিক্ষকের ছোট ছেলে প্রিয়মের সঙ্গে নিয়মিত খেলাধুলো করত। কিন্তু অত্যন্ত সুসম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই সুপরিচিত যুবকদের দ্বারাই যে এমন ভয়াবহ অপরাধ সংগঠিত হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।

হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, গত শুক্রবার গভীর রাতে গণপতিবাবুর বাড়ির তিন তলার ছাদে উঠে ইয়াবা জাতীয় মাদক সেবন করছিল ওই দুই ভাই। রাতের অন্ধকারে ছাদের শব্দ শুনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতিবাবু নিজে সেখানে গিয়ে দুই যুবককে মাদক সেবনে বাধা দেন। আর এই প্রতিবাদই কাল হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের দাবি, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার জেরে ক্ষিপ্ত হয়ে দুই ভাই মিলে তোয়ালে দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বামীর চিৎকার শুনে ছাদে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতেই তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতাকেও একইভাবে খুন করে তারা। এরপর নিজেদের অপরাধের সাক্ষী বা পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মেয়ে প্রার্থীর সঙ্গে ছোট ছেলে প্রিয়মকেও রেহাই দেয়নি অভিযুক্তরা। সকলের গলায় ফাঁস দিয়ে ঠান্ডা মাথায় চারজনকেই খুন করা হয়। তবে পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, গণপতিবাবুর স্ত্রী ও মেয়ের ওপর কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মেলেনি।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্তদের মানসিক বিকৃতি থামেনি। খুনের পর নেশার ঘোরে তারা প্রথমে গণপতিবাবুর বাড়ির বাথরুমেই স্নান করে। এরপর ফ্রিজ থেকে খেজুর এবং শসা বের করে রক্তের মাঝেই ফের মাদক সেবন করে তারা। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর অত্যন্ত ধীরেসুস্থে তারা বাড়ি থেকে চম্পট দেয়। যাওয়ার আগে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে যায়।

তদন্তে নেমে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উদ্ধার করে। চক্রবর্তী পরিবারের বাড়ির একটি টেবলের ওপর ইয়াবা সেবনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায় তদন্তকারীরা। ফ্রিজ থেকে খাওয়া খেজুরের বীজ এবং আধ খাওয়া শসার নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পাশাপাশি, একটি সোনার চুড়ি আগুনে পুড়িয়ে সেটি খাঁটি কি না, তা পরীক্ষা করার প্রমাণও পুলিশের হাতে আসে। এর থেকেই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, সোনা পরীক্ষার বিশেষ অভিজ্ঞতা বা কারিগরি জ্ঞান রয়েছে এমন কেউ এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এই সূত্র ধরে প্রযুক্তিগত ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে রবিবার ভোরেই অভিযুক্ত দুই ভাইকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং প্রতিবেশীদের বিশ্বাস ও নিরাপত্তার ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।