রাখিবন্ধনের আসল উৎস কোথায়? মহাভারতের কোন দুই কিংবদন্তির জড়িয়ে রয়েছে এই পবিত্র সুতোর সঙ্গে?

ভাই-বোনের মিষ্টি সম্পর্ক, অফুরান স্নেহ এবং ভালোবাসার এক অনন্য উৎসব হল রাখিবন্ধন। এই বিশেষ দিনে দিদি বা বোনেরা তাঁদের ভাইয়ের হাতে পবিত্র সুতো বেঁধে দেন এবং ভাইয়েরাও সারাজীবন তাঁদের পাশে থাকার ও রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু আপনার মনে কি কখনও প্রশ্ন জেগেছে, ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল এই রাখি বাঁধার চল এবং ইতিহাসের পাতা বা কোন পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে প্রথম বাঁধা হয়েছিল এই সুরক্ষাসূত্র? এই নিয়ে রয়েছে একাধিক চমকপ্রদ ও ঐতিহাসিক কাহিনি।

ভবিষ্য পুরাণের একটি অত্যন্ত প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাখির প্রথম সূচনা কিন্তু কোনো ভাই-বোনের সম্পর্কের হাত ধরে হয়নি। অসুরদের সঙ্গে এক ভয়ংকর যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্র যখন চরম বিপদের মুখে পড়েছিলেন, তখন তাঁর সুরক্ষার জন্য স্ত্রী শচী দেবী এগিয়ে আসেন। তিনি পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করে একটি লাল সুতো ইন্দ্রের ডান কবজিতে বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, এর পরেই অলৌকিক উপায়ে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র।

আরেকটি খুব সুন্দর ও মন ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে দেবী লক্ষ্মী এবং অসুররাজ বলিকে নিয়ে। ভগবান বিষ্ণু যখন পাতালপুরীতে বলির পাহারা দিতে গিয়ে বৈকুণ্ঠে আর ফিরছিলেন না, তখন দেবী লক্ষ্মী এক সাধারণ নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি পাতালে গিয়ে বলির হাতে সুতো বেঁধে তাঁকে নিজের ভাই বানিয়ে নেন। বোনকে উপহার দেওয়ার কথা বলতেই দেবী লক্ষ্মী তাঁর আসল পরিচয় প্রকাশ করেন এবং শ্রীবিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। পাতালরাজ বলিও রাখির মর্যাদা রাখতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি এবং তৎক্ষণাৎ বিষ্ণুকে মুক্তি দিয়ে তাঁর বোনের সঙ্গে স্বর্গে পাঠিয়ে দেন।

সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আবেগঘন কাহিনিটি হল শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর গভীর স্নেহের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। একবার শ্রীকৃষ্ণের আঙুল কেটে রক্তপাত হতে দেখে দ্রৌপদী এক মুহূর্তও না ভেবে নিজের নতুন শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দিয়েছিলেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, পরবর্তীকালে ভরা রাজসভায় যখন চরম অসম্মান করা হয়েছিল, ঠিক তখন দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ।

এছাড়াও, ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জনপ্রিয় বর্ণনায় রাখির উল্লেখ পাওয়া যায়। মেওয়ারের রানি কর্ণাবতী চরম বিপদে পড়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে সাহায্যের আর্জি জানিয়ে একটি রাখি পাঠিয়েছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক কাহিনি অনুযায়ী, হুমায়ুনও রাখির পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে হিন্দু রানির সেই ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে মেওয়ার বাঁচাতে রওনা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, যমরাজ ও তাঁর বোন যমুনার সম্পর্ক নিয়েও প্রচলিত রয়েছে বিশেষ লোককথা। যমুনা ভালোবেসে ভাই যমরাজের কপালে তিলক পরিয়ে হাতে পবিত্র সুতো বেঁধে দিয়েছিলেন। বোনের এই ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে যমরাজ বর দেন যে, যে ভাই বোনের থেকে এমন রাখি পরবে সে দীর্ঘায়ু লাভ করবে। সবমিলিয়ে, কে প্রথম রাখি বেঁধেছিলেন তার কোনো একটি নির্দিষ্ট উত্তর ইতিহাসে না থাকলেও, এর মূল বার্তাটি হলো একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় সম্পর্ককে আজীবন আগলে রাখা।