সূর্য ডুবলেও আর অন্ধকার হবে না পৃথিবী! অ্যাপের ইশারায় ঘরে আলো ফেলবে মহাকাশের কৃত্রিম সূর্য?

শুনতে অবিশ্বাস্য বা রূপকথার কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হলেও, প্রযুক্তি বিশ্বের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এবার সত্যি সত্যিই এক অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে এগোচ্ছে মানবজাতি। বিদ্যুতের মতো এবার কি তবে কেনাবেচা করা যাবে সূর্যের আলোও? এমনই এক অভিনব ও তাক লাগানো পরিকল্পনা নিয়ে জোরকদমে কাজ করে চলেছে ক্যালিফোর্নিয়ার খ্যাতনামা মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। তাদের এই নতুন আবিষ্কার সফল হলে আগামী দিনে পৃথিবীর চেহারাটাই বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশে বিশাল আকৃতির বিশেষ আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হবে। এর ফলে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় দিব্যি মিলতে পারে সূর্যের আলোর উষ্ণতা ও দীপ্তি। সংস্থাটি দাবি করেছে, এই বিশেষ প্রযুক্তি সফলভাবে রূপায়িত হলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে যে সমস্ত এলাকা বিদ্যুৎহীন ও অন্ধকার হয়ে পড়ে, সেখানে দ্রুত আলো পৌঁছে দিয়ে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ কার্য পরিচালনা করা অনেক বেশি সহজ হবে।
এই অভিনব প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য ভারতের অন্যতম প্রধান বেসরকারি মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গে দুটি রকেট উৎক্ষেপণের চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সামনে আসতেই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীমহলে তীব্র উদ্বেগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গবেষকদের একাংশের আশঙ্কা, মহাকাশ থেকে কৃত্রিম উপায়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার এই খেলায় রাতের আকাশের স্বাভাবিক অন্ধকার ও নিস্তব্ধতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। রিফ্লেক্ট অরবিটালের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৃথিবীর লো অরবিটে প্রায় ১৮ মিটার বাই ১৮ মিটার আকারের বিশাল আকারের আয়না স্থাপন করা হবে।
এই আয়নাগুলিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট দিকে ঘুরিয়ে সূর্যের আলো পৃথিবীর ব্যবহারকারী বা গ্রাহকদের পছন্দমতো এলাকায় প্রতিফলিত করা হবে। ফলে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে একবার সূর্য ডুবে যাওয়ার পরেও মহাকাশে ভাসমান সেই আয়নার সাহায্যে সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণে আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক পরীক্ষার সময় ব্যবহৃত এই বিশেষ আয়নাগুলি পৃথিবীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বিস্তৃত একটি এলাকায় আলো ফেলতে সক্ষম হবে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, গ্রাহকরা একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেই নির্ধারণ করতে পারবেন যে তারা ঠিক কোন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় এই কৃত্রিম আলো চান।
গ্রাহকদের সেই চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই মহাকাশে ভাসমান আয়নার অবস্থান ও দিক নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে ২০২৭ সালের মার্চের পরপরই এই অত্যন্ত সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির প্রথম বড়সড় পরীক্ষা সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অবশ্য রিফ্লেক্ট অরবিটালের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কেবল কয়েকটি পরীক্ষামূলক আয়নাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে প্রায় ৫০ হাজার স্যাটেলাইট পাঠানোর এক বিরাট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এই সংস্থা। তাদের দাবি, এই স্যাটেলাইটগুলির মাধ্যমে প্রতিফলিত হওয়া আলোর তীব্রতা চাঁদের আলোর সমান হতে পারে।
মহাকাশে ক্রমবর্ধমান স্যাটেলাইটের সংখ্যা আলোর উজ্জ্বলতা এবং স্থায়িত্ব—উভয়কেই বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি। এই পুরো প্রকল্পের প্রাথমিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ নামের একটি বিশেষ স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর সাহায্যে মূলত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় কৃত্রিম উপায়ে আলো পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিটি কতটা নিখুঁতভাবে কাজ করে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে এই পুরো পরিকল্পনার সামনে সবথেকে বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর নিজস্ব বায়ুমণ্ডল। মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসা সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তর ভেদ করে নিচে নামার সময় ঠিক কীভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত বিভিন্ন অণু ও অ্যারোসলের কারণে প্রতিফলিত আলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আশপাশের রাতের আকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার ঠিক একইভাবে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে নেমে আসা আলো মাটি থেকে প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় উপরের দিকে উঠে গিয়ে চারদিকে বিক্ষিপ্ত হতে পারে। এর ফলে ঠিক যে নির্দিষ্ট এলাকায় আলো পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার বাইরেও দেশের পর দেশ বা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অপ্রত্যাশিত আলোর আভা ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তবুও সমস্ত বাধা পেরিয়ে গত জুলাই মাসেই মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন লাভ করেছে রিফ্লেক্ট অরবিটাল। এখন দেখার, বিজ্ঞানের এই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবে কতটা সফল হয়।