সিনেমাহল নয়, যেন আস্ত একটা উৎসব! আশির-নব্বইয়ের দশকের দেওঘরের এই প্রেক্ষাগৃহের গল্প শুনলে নস্টালজিক হবেনই!

আজ বিনোদনের জন্য মানুষের হাতে মোবাইল, ওটিটি এবং বিলাসবহুল সিনেমা হলের মতো একাধিক বিকল্প রয়েছে। যখন ইচ্ছা হল, মোবাইলে সিনেমা দেখে নেওয়া যায় অথবা পরিবারের সঙ্গে মাল্টিপ্লেক্সে পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন সিনেমা দেখা কোনও উৎসবের চেয়ে কম ছিল না। সাইকেল নিয়ে সিনেমা হলে পৌঁছনো, টিকিটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, সিনেমা শুরু হতেই দর্শকদের শিসে গোটা হল গমগম করে ওঠা এবং বিরতির মাঝে এক টাকার ছোলা-বাদাম কিনে খাওয়া—সবই ছিল সেই সময়ের বিনোদনের অঙ্গ। ঝাড়খণ্ডের দেওঘরেও এমন একটি ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ছিল, যেখানে সিনেমা দেখতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমতো। নাম ছিল ‘শঙ্কর টকিজ’। আজ এই সিনেমা হলের জৌলুস আগের মতো না থাকলেও, আশির ও নব্বইয়ের দশকে এটি ছিল দেওঘর শহরের প্রাণকেন্দ্র।

শঙ্কর টকিজের মালিক ছিলেন দশরথ সিং। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সি সুবোধ চন্দ্র রায় পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করে জানান, সেই সময়ের পরিবেশটাই ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষ সাইকেলে চড়ে সিনেমা দেখতে আসতেন। টিকিট কাটার সময় এতটাই ভিড় ও ধাকধাক্কি হতো যে অনেক সময় পদপিষ্ট হওয়ার উপক্রম হতো। তা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে সিনেমা দেখার উন্মাদনায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ত না। টিকিট কেনার জন্য চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। আজকের মতো অনলাইন বুকিং না থাকায় সেই সময় টিকিট পাওয়াটাই ছিল এক মস্ত বড় সাফল্য।

সিনেমা চলাকালীন হলের ভেতরকার পরিবেশ ছিল দারুণ জমজমাট। পর্দায় পছন্দের নায়ককে দেখামাত্রই দর্শকরা আনন্দে শিস দিতে শুরু করতেন। খিদে পেলে বাইরে থেকে এক টাকায় চিনিয়া বাদাম কিনে, তার সঙ্গে নুন ও লঙ্কা মিশিয়ে খাওয়া ছিল এক অপরিহার্য অভিজ্ঞতা। তখন না ছিল দামি পপকর্নের চল, না ছিল বড় কোনো ফুড কাউন্টার। অন্য এক স্থানীয় বাসিন্দা নবীন রায় জানান, টিকিটের দাম ছিল মাত্র ২৫ পয়সা। তাছাড়া বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রোজেক্টর সচল রাখতে ট্র্যাক্টরের ইঞ্জিনের সাহায্য নেওয়া হতো, যা ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি, পড়ুয়াদের জন্য সকালের বিশেষ শো-এরও ব্যবস্থা থাকত।

সময়ের পালাবদলে বিনোদনের মাধ্যম বদলে গেছে। পুরনো সিঙ্গল স্ক্রিনের জায়গা নিয়েছে মাল্টিপ্লেক্স ও আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু শঙ্কর টকিজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলি আজও দেওঘরের প্রবীণ বাসিন্দাদের মনে জীবন্ত। একসময়ের সেই প্রাণের আড্ডাখানা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty