‘যিশুকে বিশ্বাস করাই কি আমাদের অপরাধ?’ অষ্টমীর দিন খ্রিষ্টান পরিবারের ওপর তান্ডব, কাঠগড়ায় কট্টরপন্থী সংগঠন

পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণায় ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর এক চরম আঘাতের অভিযোগ উঠেছে। খ্রিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী একটি পরিবারকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক মন্দিরে অঞ্জলি দেওয়ানো, প্রসাদ খাওয়ানো এবং মারধরের গুরুতর অভিযোগ উঠল স্থানীয়দের একাংশের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র চন্দ্রকোণা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহাঅষ্টমীর দিন কয়েকজন দুষ্কৃতী তাঁদের বাড়ির তালা ভেঙে অনধিকার প্রবেশ করে। অভিযোগ, বাড়িতে ঢুকেই চালিয়াতি ও তাণ্ডব চালায় দুষ্কৃতীরা এবং নথিপত্রসহ নগদ টাকা-পয়সা লুট করে নেয়। এরপর পরিবারের সদস্যদের জোর করে টেনে-হিঁচড়ে স্থানীয় একটি মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ানো হয় এবং প্রসাদ খেতে বাধ্য করা হয়।
পরিবারের এক প্রবীণ সদস্য ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, “আমরা খ্রিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী এবং যিশুর প্রার্থনা করি। অষ্টমীর দিনে আমাদের বাড়ির বৌমাকে জোর করে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ানো হয়েছে। কয়েকজন বজরং দলের সদস্য এসে আমাদের ওপর এই অত্যাচার চালিয়েছে, মারধর করেছে। যিশুকে বিশ্বাস করাই কি আমাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ?” ঘটনার পর পরিবারটি চন্দ্রকোণা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। এফআইআরে মারধর, লুটপাট এবং খ্রিষ্ট ধর্ম না ছাড়লে প্রাণনাশের হুমকির স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার গাম্ভীর্য বিচার করে স্থানীয় প্রশাসন ওই পরিবারের সুরক্ষায় পুলিশ মোতায়েন করেছে। তবে আতঙ্কের ছায়া কাটেনি ভুক্তভোগীদের মন থেকে। পরিবারের এক সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন, “পুলিশ এখন পাহারা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যখন পুলিশ থাকবে না, তখন আমাদের কী হবে?” এদিকে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, অভিযোগ খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। কংগ্রেস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিজেপি ও কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোকে নিশানা করেছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় চন্দ্রকোণার বিজেপি বিধায়ক জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বিশদে জানেন না, তবে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। তিনি স্পষ্ট করেন, অন্যায় কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং পুলিশকে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষ অভিযোগ তুলেছিলেন যে রাজ্যে খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা বাড়ছে। কিছুদিন আগেই শাসকদলের প্রতিনিধিরা আর্চবিশপের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং উত্তর ২৪ পরগনার বামাপুকুরে ডিভাইন মার্সি গির্জাতেও সরেজমিনে পরিদর্শনে যান। চন্দ্রকোণার এই সাম্প্রতিক ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্নের সৃষ্টি করল।