মোদী-পুতিন-জিনপিংয়ের মেগা মঞ্চে ভারতের বিরাট কূটনৈতিক জয়! বিশ্ব রাজনীতিতে রচিত হল নতুন ইতিহাস

নয়াদিল্লিতে আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ব্রিকস বিজনেস সামিট (BRICS Business Summit)-এর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছবি যেন বর্তমান বিভক্ত ও উত্তপ্ত বিশ্বের দরবারে ভারতের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থানের নিখুঁত প্রকাশ ঘটিয়েছে। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের ঠিক পাশেই উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান জটিল সমীকরণের নিরিখে এই বিশেষ মুহূর্তটি আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিচার করলে এই ছবিটির সময় ও গুরুত্ব অপরিসীম। একদিকে ইরান বর্তমানে এমন এক গুরুতর সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সুয়েজ ও লোহিত সাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্য বড়সড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা বিশ্বের একের পর এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত রয়েছে রাশিয়া। এই অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর মুহূর্তে দাঁড়িয়েও ভারত একদিকে যেমন ইরান ও রাশিয়ার মতো পরীক্ষিত ও পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্ত পথ খোলা রেখেছে, তেমনই আমেরিকা ও ইউরোপীয় শক্তিগুলির সঙ্গে নিজেদের সুদৃঢ় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ বা কৌশলগত অংশীদারিত্ব সমানভাবে অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
আন্তর্জাতিক শক্তির এই ভারসাম্য রক্ষা করার বহুমুখী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একান্ত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও। বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত ও শত্রুতা অবিলম্বে বন্ধ করে সমস্ত পক্ষকে কূটনৈতিক আলোচনা ও সংলাপের টেবিলে ফিরে আসার জোরালো সওয়াল করেছেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, বিশ্বজুড়ে যে সংঘাতই চলুক না কেন, সাধারণ নাগরিক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সমুদ্রের বুকে কর্মরত নাবিকদের সুরক্ষা যেকোনো মূল্যে সুনিশ্চিত করতেই হবে। সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতা এবং বিশ্ব বাণিজ্য যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
একই রকম শান্তির সুর ফুটে উঠেছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও। দুই রাষ্ট্রনেতার উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, শক্তি (Energy) উৎপাদন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে উঠে আসে। পাশাপাশি, ইউক্রেন সংকটের একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে যে নীতিগত অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তা পুতিনের কাছে ফের দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তুলে ধরেন নরেন্দ্র মোদী। নয়াদিল্লি বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির কোনো সংঘাতপূর্ণ লড়াইয়ে ভারত কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক বা নিরপেক্ষ দেশ হয়ে বসে নেই, বরং ভারত সবসময় সরাসরি ‘শান্তির পক্ষে’ দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়।
কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক শিবিরে অন্ধভাবে শামিল না হয়ে, ভারত আজ বৈশ্বিক মঞ্চে অত্যন্ত পরিপক্বতার পরিচয় দিচ্ছে। পৃথিবীর বহুমুখী ও বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রগুলির সঙ্গেই নিয়মিত গঠনমূলক বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে নয়াদিল্লি। ভারতের এই বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’। ব্রিকস বিজনেস ফোরামের সেই বিশেষ আলোকচিত্রটি কার্যত গোটা বিশ্বকে এই বার্তাই দিল যে, ক্রমবর্ধমান বিভাজনে বিভক্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারত বর্তমানে এক অবিসংবাদিত কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। একদিকে ইরান ও রাশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলা, আর অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত রাখা—ভারত এই মুহূর্তে কূটনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।