নির্মীয়মাণ গুদাম ভাঙার মর্মান্তিক দুর্ঘটনা! ১৬ জনের মৃত্যুর তদন্তে লালবাজারের জালে আরও এক পুর আধিকারিক

রাজধানী কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক তারাতলা বিপর্যয় কাণ্ডে তদন্তে আরও এক বড়সড় অগ্রগতি করল লালবাজারের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। গত ২৪ জুন তারাতলায় একটি নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৬ জন সাধারণ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্তে নেমে শুক্রবার কলকাতা পুরনিগমের বিল্ডিং বিভাগের এক সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃত ওই পুর আধিকারিকের নাম আমিনুর শেখ (২৮), যাঁকে দক্ষিণ কলকাতার বাঁশদ্রোণী এলাকা থেকে পাকড়াও করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তারাতলার ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের বিল্ডিং সংক্রান্ত সমস্ত নির্মাণ কাজের তদারকি ও অনুমোদনের দায়িত্বে ছিলেন এই আমিনুর। ফলে গুদামটির নির্মাণ কাজের অনুমোদন, নকশা এবং সংশ্লিষ্ট সমস্ত আইনি নথিপত্রের বিষয়ে তাঁর ঠিক কী ভূমিকা ছিল, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতা পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে আর কারা কারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে, সেই সমস্ত দিকগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, তারাতলা বিপর্যয়ের এই মামলায় এর আগেও একাধিক হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই নিয়ে মোট ৭ জন অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা হলো। এর আগে আয়ান ট্রেডার্সের সুপারভাইজার গুলজার হুসেন, লোহার কাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা কমল সামন্ত, জমির লিজ নেওয়া শম্ভুনাথ বেহেরা, শ্রমিক সরবরাহকারী দিবাকর ভান্ডারি এবং কলকাতা পুরনিগমের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্ত আবদুল হামিদকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে কলকাতা পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের তৎকালীন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও গত ২৫ জুন গ্রেফতার করা হয়েছিল। আর এবার পুরনিগমের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুরকে গ্রেফতার করার ফলে সামগ্রিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭টিতে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকার উপর অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ওই বিশাল গুদাম নির্মাণের কাজ চলছিল। গত প্রায় দেড় বছর ধরে সেখানে কাজ চলার পরও কীভাবে এমন মারাত্মক কাঠামোগত ত্রুটি বা অনিয়ম প্রশাসনের নজরে এল না, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ঘটনার পর অনুমোদিত নকশা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয় লালবাজার। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞরা দেখেন যে, নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রীর গুণমান কেমন ছিল, নকশায় কোনো গরমিল ছিল কি না এবং নির্মাণের সময় যথাযথ নিয়ম মানা হয়েছিল কি না। মূলত নকশা তৈরির ত্রুটি, পুরনিগম থেকে সেই নকশার অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং নির্মাণের সময়কার গাফিলতি—এই তিন প্রধান বিষয়কে সামনে রেখেই সিটের তদন্ত জোরকদমে এগিয়ে চলেছে।