মৃত্যুর ঠিক আগে ইউটিউব পোস্টে কার দিকে আঙুল তুললেন মা? মহারাষ্ট্রের মর্মান্তিক ত্রিমৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় রাজ্য!

মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজীনগরে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনায় পাহাড় থেকে নিচে পড়ে মৃত্যু হয়েছে একই পরিবারের তিন সদস্যের—বাবা, মা এবং তাঁদের একমাত্র তরুণ ছেলের। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ একে নিছক দুর্ঘটনা বা আইফোনের একটি কিস্তি বা ইএমআই (EMI) নিয়ে পারিবারিক বচসার ফল বলে মনে করলেও, তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা পারিবারিক অশান্তি, সম্পত্তিগত বিবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রহস্যময় পোস্ট এই মৃত্যুকে এক গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করছে।

গত শুক্রবার সম্ভাজীনগরের তিসগাঁও এলাকার কোঢ্যা পাহাড়ে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন ১৮ বছরের তরুণ কুণাল, তাঁর বাবা মুরলীধর এবং মা সঙ্গীতা। ঘটনার আকস্মিকতা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে প্রথমে অনেকেই এটিকে সাধারণ দুর্ঘটনা ভেবেছিলেন। তবে ঘটনার কিছুদিন আগে মৃতার ইউটিউব চ্যানেলে করা একটি রহস্যময় পোস্ট এবং মৃত্যুর ঠিক আগের দিন আপলোড করা একটি আবেগঘন ভিডিও সমস্ত জল্পনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর ঠিক আগের দিনগুলিতে ইউটিউবে বেশ কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা শেয়ার করেছিলেন মা সঙ্গীতা। গত শুক্রবার নিজের চ্যানেলে করা একটি পোস্টে তিনি সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, “তুমি সম্পত্তি থেকে আমার আর আমার ছেলের অধিকার কেড়ে নিয়েছ। ভাইদের সঙ্গে বাবা-মায়ের মিল হতে দাওনি। আমার সুখের সংসার তুমি ধ্বংস করে দিয়েছ… এটা পাপ, তোমার সাত পুরুষ এই ফল ভুগবে।” যদিও তিনি সরাসরি কারোর নাম নেননি, তবে এই অভিশাপমূলক পোস্টটি যে পারিবারিক সম্পত্তি বিবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তা স্পষ্ট। এর পাশাপাশি, মৃত্যুর আগের দিন বৃহস্পতিবার শেয়ার করা অন্য একটি ভিডিওতে সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে মারাঠী ভাষায় তিনি বলেছিলেন যে, সম্পর্ক উভয় দিক থেকেই সমান হওয়া উচিত এবং যেখানে গুরুত্ব নেই, সেখানে জোর করার কোনো মানে হয় না।

তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে যে আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে এই পরিবারের বড় ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকেই গৃহশান্তি বিঘ্নিত হতে শুরু করে। পেশায় গাড়িচালক মুরলীধর সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন এবং প্রায়শই বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন। সম্প্রতি তিনি বাড়ি ফেরেন, আর বাড়ি ফেরার পরেই আইফোনের ইএমআই বা কিস্তির টাকা দেওয়া নিয়ে ছেলের সঙ্গে তাঁর তীব্র কথা কাটাকাটি ও বচসা বাধলে পরিস্থিতি চরমে ওঠে।

ঘটনার দিন সকালে তুমুল পারিবারিক অশান্তির জেরে কুণাল হঠাৎই বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা কোঢ্যা পাহাড়ের খাদের ধারে গিয়ে উপস্থিত হন। তাঁকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচাতে বা নিরস্ত করতে তৎক্ষণাৎ তাঁর বাবা ও মা দুজনেই পিছন পিছন সেখানে ছোটেন। প্রায় তিন দীর্ঘ ঘণ্টা ধরে তাঁরা ছেলেকে বোঝানোর এবং শান্ত করার চেষ্টা চালান। কিন্তু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায় যখন কুণালকে খাদের কিনারা থেকে নিরাপদ দূরত্বে টেনে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে বাবা মুরলীধর এবং ছেলে কুণাল দুজনেই পা ফস্কে গভীর খাদে পড়ে যান। চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানকে এইভাবে চিরতরে হারিয়ে ফেলার তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মা সঙ্গীতাও সঙ্গে সঙ্গে খাদে ঝাঁপ দেন।

প্রাথমিক অনুমান এবং পারিপার্শ্বিক তথ্য বলছে, শুধুমাত্র একটি মোবাইল ফোনের ইএমআই নিয়ে বিবাদই এই মৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়; এর পেছনে বহুদিনের জমে থাকা পারিবারিক কলহ, অবহেলা এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত গভীর ক্ষোভ কাজ করছিল। পুলিশ বর্তমানে সঙ্গীতার ইউটিউব অ্যাকাউন্ট, সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বয়ান খতিয়ে দেখে পুরো ঘটনার সত্যতা উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং প্রশ্ন উঠছে একটি হাসিখুশি পরিবার কীভাবে মুহূর্তের ভুলে ধ্বংস হয়ে গেল।