মুর্শিদাবাদের বুকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের সুর! নবাব আমলের সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহাসিক ঘণ্টাঘর আজ চরম অবহেলায় বিকল

ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ শহরের দক্ষিণ দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই ডানদিকে চোখে পড়ে বহু পুরনো ঐতিহাসিক ঘণ্টাঘর। একসময় এই ঘণ্টার ধ্বনিতেই শহরবাসী সময়ের খবর পেতেন এবং রাজকীয় আমলের স্পন্দন অনুভব করতেন। কিন্তু কালের নিয়ম এবং চরম উদাসীনতার জেরে আজ সবটাই অতীত। মুর্শিদাবাদ এস্টেটের তত্ত্বাবধানে থাকা এই অমূল্য ঐতিহাসিক ঘণ্টাটি দীর্ঘদিন ধরেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৮১০ বা তার কাছাকাছি সময়ে নবাব আলিজার আমলে এই ঘণ্টাঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই সময় এই ঘণ্টাঘর তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল সৈন্যদের জরুরি পরিস্থিতিতে সতর্কীকরণ করা এবং সঠিক সময় জানানো। নবাব পরিবার সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দক্ষিণ দরজার সামনে যেখানে সিরাজউদ্দৌলা পার্ক রয়েছে, সেখানেই একসময় নবাব জাইন-উদ্দিন-আলি খান বা নবাব আলিজার রাজপ্রাসাদ ছিল। সেই প্রাসাদ সহ সমগ্র কেল্লা চত্বরের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল এই দক্ষিণ দরজা।

দক্ষিণ দরজা লাগোয়া ঘণ্টাঘরের পাশেই ঐতিহাসিক সৈন্য ক্যাম্প আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও বর্তমানে সেখানে সাধারণ মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। একসময়ে নির্দিষ্ট কিছু সময়ে সৈন্যদের সতর্ক করার জন্য বা প্রহর জানাতে সেই বিশাল ঘণ্টা বাজানো হতো। শুধু সেনাদলই নয়, সেই ঘণ্টার গম্ভীর আওয়াজ শুনে সময় ও বার্তা জানতে পারতেন আশেপাশের এলাকার সাধারণ মানুষও। একসময় নিয়ম করে কর্মচারীরা দড়ি টেনে এই ঘণ্টা বাজাতেন, কিন্তু সেই দায়িত্বে থাকা কর্মীরা একে একে অবসর নেওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় সেই ঐতিহাসিক ধ্বনি।

কয়েক বছর আগে একবার বিক্ষিপ্তভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলেও, বর্তমানে পর্যাপ্ত সংস্কারের অভাবে বেহাল দশায় পড়ে আছে এই ঐতিহ্যশালী ঘণ্টাঘর। যে কারণে বর্তমানে ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদে ঘুরতে আসা হাজার হাজার পর্যটক এসেও আর সেই ঐতিহাসিক ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পান না, যা নিয়ে পর্যটক মহলেও তীব্র ক্ষোভ ও মনখারাপের সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টাটি দেখভালের সম্পূর্ণ দায়িত্ব মুর্শিদাবাদ এস্টেটের হাতে ন্যস্ত থাকলেও, এস্টেটের ম্যানেজার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এই বিকল ঘণ্টা মেরামতের ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের স্পষ্ট দাবি, এটি কেবল একটি সাধারণ বা ধাতব ঘণ্টা নয়; এটি সমগ্র মুর্শিদাবাদের গৌরবময় ইতিহাস, নবাবী সংস্কৃতি এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমূল্য স্মারক। অবিলম্বে রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘণ্টাটিকে ফের সচল করে তোলার জোরালো দাবি উঠেছে সর্বস্তরে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রশাসনের সর্বোচ্চ নজরে এসেছে এবং অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে।